ভার্গো টোব্যাকোর বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে প্রথমে ‘নিউজ না করার’ অনুরোধ এবং পরে হুমকির মুখে পড়েন কালবেলার সিনিয়র রিপোর্টার শেখ হারুন। নিজেকে ক্যাপ্টেন রায়হান পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন, তিনি কোম্পানির মালিকপক্ষের ঘনিষ্ঠ এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করেন। কথোপকথনের শুরুতেই তিনি বলেন, বিষয়টি কাস্টমস ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘অফিসিয়ালি ডিল’ করা হচ্ছে এবং এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রথমদিকে তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে বলেন, কাস্টমস বা ভ্যাট কর্মকর্তারা অনেক সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করেন, অসংগতি মনে হলে মামলা করেন—পরে ডকুমেন্ট দিয়ে সেগুলো সমাধান করা হয়। তার ভাষায়, এ ধরনের বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন নেই, কারণ বিষয়টি কাস্টমসের সঙ্গে আমরা অফিসিয়ালি ডিল করছি।
বারবার ক্যাপ্টেন রায়হান পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি কথোপকথনের এক পর্যায়ে নিজের প্রভাবশালী যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি সামরিক ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং অতীতে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রায়হান বলেন, ‘আমি অনেক জায়গায় কাজ করেছি। বড় বড় গ্রুপের সঙ্গেও কাজ করেছি। আমাদের অনেক জায়গায় যোগাযোগ আছে। আমাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে—আপনি চাইলে খোঁজ নেন, জানতে পারবেন।’
এ সময় তিনি নিউজ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালবেলা প্রতিবেদকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্যে গুলশানে কফি পানের দাওয়াত দেন। তিনি বলেন, ‘আসেন একদিন ওয়েস্টিনে বসি, আড্ডা দিই, কথা বলি।’ এ সময় প্রতিবেদক তাকে কালবেলা অফিসে এসে রং চা খাওয়ার দাওয়াত দেন এবং কিছু বলার থাকলে অফিসে এসে বলার পরামর্শ দেন।
পরে কালবেলা প্রতিবেদক রায়হান নামের ওই ব্যক্তির কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য নিশ্চিত হতে না পেরে এবং প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বক্তব্যের প্রয়োজনে গত শনিবার সন্ধ্যার পর কোম্পানির ডিএমডি অমল হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বক্তব্য নেন। ওই কর্মকর্তা কালবেলা প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে মামলার বিষয়টি স্বীকার করে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন।
কিন্তু অমল হালদারের বক্তব্য নেওয়ার পরপরই রায়হান নামের ওই ব্যক্তি ফোন দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি প্রতিবেদকের কাছে কৈফিয়ত চেয়ে প্রশ্ন করতে থাকেন! প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে ডিএমডিকে ফোন দিয়ে বক্তব্য নিয়েছেন জানালে তিনি উত্তেজিত হয়ে ফের প্রশ্ন করেন—‘আপনি কেন অমল সাহেবকে ফোন দিয়েছিলেন। আপনি কেন ফোন দিচ্ছেন? আপনি কি কাস্টমস কমিশনার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ? আপনাকে কে অথরাইজ করেছে?’
তিনি বলেন, ‘আপনি তো ফোন দেওয়ার অথরিটি না। আপনি তো পুলিশ না, আপনি কাস্টমসের… না। আপনি কেন ফোন দেবেন উনাকে? আপনার কথা বলতে হলে তো গাজীপুরের কমিশনারের, কাস্টমসের অনুমতি নিতে হবে। পারমিশন ছাড়া আপনি কেন ফোন দিয়েছেন? এজন্য র্যাব-পুলিশ দিয়ে আপনাকে ফোন দেওয়াবো।’
ফোনালাপের শেষ দিকে তিনি প্রতিবেদককে ভবিষ্যতে কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করতে বলেন এবং আবার যোগাযোগ করলে ‘ব্যক্তিগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেও হুমকি দেন।
এতেই তিনি ক্ষান্ত হননি। কিছুক্ষণ পর কালবেলা প্রতিবেদকের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে দুটি ভয়েস মেসেজে পাঠান রায়হান নামের ওই ব্যক্তি। ভয়েস মেসেজের শুরুতে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি এরই মধ্যে র্যাব-১-এর সিও রবিউল ইসলাম এবং পুলিশের এসপির সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের জানিয়েছি, আপনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে হয়রানি করছেন। খুব বেশি বিরক্ত করছেন। আপনি শত্রুতা তৈরি করছেন। প্রয়োজনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবেও বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে।’
পরে আরও একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর বিরক্ত করবেন না। কেউ যদি আপনাকে উসকানি দিয়ে এসব করাতে চায়, তাকে পরিষ্কার বলে দেবেন এখানে অনেক উচ্চ পর্যায়ের লোকজন আছে। …আমার পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড যদি না জানেন, আপনি এসে খোঁজ নিয়ে জেনে যাবেন। না হলে আমি রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে বিষয়টি ডিল করব।’
পরে তার বক্তব্য আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তিনি প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে বলেন—‘আমি চাই না যে, আমাকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে হয়; কিন্তু যদি আমাকে বিষয়টা পার্সোনালি ডিল করতে হয়, সেটা আপনার জন্য ভালো হবে না, আপনার অবস্থা খুবই খারাপ হবে। নেক্সট টাইম আমি আপনার সঙ্গে ফোনে কোনো কথা বলব না। আপনি এবং আপনার ফ্যামিলি সুন্দর এবং শান্তিমতো থাকেন, আমাকে উত্তেজিত করবেন না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালবেলা প্রতিবেদককে হুমকি দেওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. রায়হানুল ইসলাম। তিনি একসময় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। বছর দুয়েক আগে অবসরে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভার্গো টোব্যাকোর মালিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং বর্তমানে তিনি শাফায়েতুল ইসলামের বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যানুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন রায়হানুল ইসলামের স্থায়ী ঠিকানা ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া উপজেলার কালমেঘে। বর্তমান ঠিকানা—কে.ডি ঘোষ রোড, রংপুর সদর, রংপুর। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ২৮ বছর ৮ মাস।