দীর্ঘদিন ধরে তথ্য গোপন করে অবৈধভাবে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করছে ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড। রাজস্ব ফাঁকি দিতে অপ্রদর্শিত তামাক ব্যবহার করে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। গত সাত মাসে তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড। বিশেষ অভিযানে পাওয়া তথ্য ও এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনের (ঢাকা উত্তর) তদন্তে ভার্গো টোব্যাকোর কর ফাঁকির জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
কালবেলার হাতে আসা নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভার্গো টোব্যাকো স্থানীয় উৎস থেকে কেনা বেশিরভাগ তামাক রিটার্নে দেখায়নি, অঘোষিত তামাক দিয়ে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করেছে, বিক্রির পরও ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক জমা দেয়নি। এভাবে প্রায় ৩৫৯ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানি ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেড অবৈধ অফিস থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়েছে এবং আর্থিক বিবরণীতেও দিয়েছে মিথ্যা তথ্য। ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক জমা না দেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ফ্যাক্টরি এবং অফিসে অভিযান চালায় উত্তর ভ্যাটের একটি প্রিভেন্টিভ টিম। গত ১৭ আগস্ট ঢাকার বারিধারায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ও গাজীপুরের সিগারেট উৎপাদন কারখানায় অভিযান চালান ভ্যাট কর্মকর্তারা। দুটি অফিসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন নথি ও আর্থিক তথ্য জব্দ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানের সময় বারিধারার ডিওএইচএস এলাকার ২১২ নম্বর ভবনে ভার্গো টোব্যাকোর একটি অফিসে দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছিল, কিন্তু সেটি ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় ছিল না। একই সময় গাজীপুর সদর উপজেলার কাউলতিয়ায় কোম্পানির কারখানায় অভিযান চালিয়ে সিগারেট উৎপাদনের নানা প্রমাণ পায় এই টিম। যেখানে অবৈধভাবে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রয় হচ্ছিল। অভিযানে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মূসক রেজিস্টার, কম্পিউটার, পেনড্রাইভ ও ইমেইল সার্ভার থেকে বিপুল পরিমাণ নথি জব্দ করা হয়।
কালবেলার হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, স্থানীয় উৎস থেকে তামাক কিনে ভার্গো টোব্যাকো সেটি রিটার্নে দেখায়নি; বরং সেই তামাক দিয়ে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি করে তার বিপরীতে প্রাপ্য ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্কও জমা দেয়নি। এ ছাড়া কোম্পানির অফিসিয়াল ইমেইল থেকে পাওয়া ১০৯টি ফাইল ও তিনটি ফোল্ডারে থাকা তথ্যেও গোপন লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির মামলা করেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (ঢাকা উত্তর)। যদিও এর আগে কোম্পানিটির বিরুদ্ধের আরও একটি কর ফাঁকির মামলা করা হয়েছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একই কমিশনারেট থেকে মামলা দুটি করা হয়। প্রথম মামলাটি ছিল ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট এবং পরেরটি একই বছরের নভেম্বরে।
মামলার নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তদন্তে জব্দ করা নথি ও প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা কাগজপত্র অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই (৭ মাস) পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটি স্থানীয় উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ তামাক ক্রয় করলেও তার একটি বড় অংশ মূসক রেজিস্টারে দেখায়নি। প্রতি কেজি ২২১ টাকা দরে কেনা ওই তামাকের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘোষিত মজুত, রপ্তানি এবং উৎপাদনজনিত স্বাভাবিক অপচয় (২২ দশমিক ২৬ শতাংশ) বাদ দেওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তামাকের কোনো হিসাব নেই। এই গোপন তামাক ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সিগারেট উৎপাদন করা হয়েছে। কোম্পানিটির উৎপাদন অনুপাত অনুযায়ী (প্রতি এক হাজার শলাকা সিগারেটে শূন্য দশমিক ৭৭৭৪৫ কেজি তামাক) হিসাব করলে প্রায় ১১০ কোটি ৮৫ লাখ শলাকা সিগারেট গোপনে উৎপাদন করা হয়েছে। প্রতি শলাকার সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য ৫ টাকা ধরে এসব সিগারেটের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৫৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এই বিক্রয়মূল্যের ওপর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট হিসাব করলে সরকারের মোট পাওনা দাঁড়ায় প্রায় ৩৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৬ আগষ্ট কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ৮৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার আরও একটি করফাঁকি মামলা ছিল। ফলে নতুন তদন্তে ওই দাবির বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৯১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা সম্পূরক শুল্ক এবং ৬৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা ভ্যাট। অর্থাৎ দুই মামলা ভার্গো টোব্যাকের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৪৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী আদায়যোগ্য।
এ ঘটনায় ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডের বিরুদ্ধে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং বিধিমালা, ২০১৬-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী মূসক ফাঁকির মামলা দায়ের করা হয়েছে। এনবিআরের ঢাকা উত্তর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভার্গো টোব্যাকো ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দিয়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি করেছে এবং আইন লঙ্ঘন করেছে। মামলা সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি কর ফাঁকির মামলায় ৮৭ কোটি ৩৭ লাখ এবং ৩৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই মামলা মিলিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৪৪৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনবিআরের অভিযানে ভার্গো টোবাকোর কার ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসার পর থেকে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে মামলা না করার জন্য বারবার এনবিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এমনকি কর ফাঁকির বিষয়টি গোপন করার জন্য এনবিআরের শুনানিতে ভুয়া ব্যাংক লোনসহ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দেয় ভার্গো কর্তৃপক্ষ। তবে কোনো কিছুতেই সাড়া না দিয়ে ভার্গো টোব্যাকোর বিরুদ্ধে কর ফাঁকির মামলা দেওয়া হয়। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, তামাক শিল্পে এ ধরনের রাজস্ব ফাঁকি সরকারের আয় কমিয়ে দিচ্ছে এবং বাজারে অসাধু প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। তারা বলেন, এ খাতে নিয়মিত নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কর শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তামাক খাতে কর ফাঁকি রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর হুমকি। ভার্গো টোব্যাকোর বিরুদ্ধে প্রমাণসহ মামলা করা হয়েছে। এখন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনবিআর সূত্র বলছে, প্রথম মামলাটি ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটের গুলশান বিভাগ থেকে করা হলেও নতুন কমিশনারেট হওয়ায় মামলাটি বর্তমানে এটি গাজীপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, যেহেতু ভার্গো টোব্যাকোর কারখনা গাজীপুরে অবস্থিত এবং গাজীপুরে নতুন কমিশনারেট হয়েছে, তাই মামলাটি সেখানে স্থানন্তর করা হয়েছে। এখন মামলার পরবর্তী ধাপ গাজীপুর কমিশনারেট দেখবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর ভ্যাটের কমিশনার মো. সামছুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ভার্গো টোব্যাকোর নামে একটি মামলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এরই মধ্যে আলাদা কমিশনারেট হওয়ার কারণে আমরা গাজীপুর ভ্যাট কমিশনারেটে স্থানান্তরিত করেছি। গাজীপুর ভ্যাট কমিশনারেটের মাধ্যমে এনবিআরের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে যাবে মামলাটি।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গাজীপুর ভ্যাটের কমিশনার এ কে এম নুরুল হুদা আজাদ কালবেলাকে বলেন, হ্যাঁ, এমন একটি মামলা আমাদের কাছে এসেছে।
জানা গেছে, ভার্গো টোব্যাকোর মালিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম। তথ্য গোপন করে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে বক্তব্যের জন্য কালবেলার পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকতার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি এবং কোম্পানির অফিসিয়াল ইমেইলে মেইল করেও সাড়া মেলেনি।
কোম্পানির কারও বক্তব্য না পাওয়ায় মামলার বিষয়ে খোঁজ নিতে এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে গাজীপুরে ভার্গো টোব্যাকোর কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে উৎপাদন কার্যক্রম। কারখানায় উপস্থিত কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবু নাসের মোহম্মদ আশরাফের কাছে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালবেলাকে বলেন, তামাকের মজুত ও ব্যবহারের তথ্যের সঙ্গে সিগারেট উৎপাদনের হিসেবে গরমিলের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। এখানে আমরা শুধু ফ্যাক্টরি অপারেশনের কাজগুলো দেখাশোনা করি। কেনাকাটার কাজ হেড অফিস থেকে করা হয়।
এ ছাড়া মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাতে না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। মামলা-সংক্রান্ত কোনো অফিসিয়াল ডকুমেন্টস বা কপি এখন পর্যন্ত আমাদের ফ্যাক্টরিতে এসে পৌঁছায়নি। যেহেতু এটি আইনি বিষয়, তাই মামলার বিস্তারিত আমাদের হেড অফিস বলতে পারবে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়া এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তবে কারখানায় রায়হান নামে একজন নিজেকে ক্যাপ্টেন এবং সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার কারণে জানতে চান এবং এ প্রতিবেদকের সঙ্গে উচ্চবাচ্যও করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি এনবিআর দেখছে, আপনার খোঁজ নেওয়ার দরকার কি? এটা এনবিআর এবং আমাদের কোম্পানির বিষয়। অলরেডি এটা নিয়ে ডিলিংসের চেষ্টা চলছে। এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া বলে জানান তিনি।
তবে রায়হানের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তার বক্তব্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হিসেবে গণ্য না করে পরবর্তী সময়ে ভার্গো কোম্পানির ডিএমডি অমল হালদারের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করে সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রমাণিত হয়নি। তার দাবি, কোম্পানির ব্যবসার বড় অংশই রপ্তানিনির্ভর এবং এনবিআর যে তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ তুলেছে, সে পরিমাণ রপ্তানির কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। ডকুমেন্ট জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ যদি এমন অভিযোগ করে, সেটা তাদের কথা। আমরা কেন ভুয়া ডকুমেন্ট দেব? আমাদের সব কাগজপত্র বৈধ। বিষয়টি বর্তমানে এনবিআরের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং শুনানিতে কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে অমল হালদারের বক্তব্য নেওয়ার পর প্রতিবেদককে আবারও ফোন দেন ক্যাপ্টেন রায়হান পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি। ফোন দিয়ে হুমকির স্বরে কেন অমল হালদারকে ফোন দেওয়া হয়েছে সেটার কৈফিয়ত চান তিনি। প্রথমবার নিজেকে ভার্গো কোম্পানির মালিক সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করলেও এবার তিনি পরিচয় দেন তার উপদেষ্টা হিসেবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রভাবশালীর নামও নিতে থাকেন। এ ছাড়া প্রতিবেদককে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন রায়হান নামের ওই ব্যক্তি।