Image description
জনমনে বাড়ছে সংশয় কৌতূহল । কেউ যদি জুলাই সনদকে নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়, তাহলে তা হবে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা- ড. বদিউল আলম মজুমদার ।

জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কোন পথে-এ নিয়ে মুখোমুখি এখন সরকার ও বিরোধী দল। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, রাষ্ট্র আবেগ নিয়ে চলে না, চলে সংবিধান ও আইন দিয়ে। দলটি বলেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হতে পারে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানিয়েছে বিএনপি। অপরদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটের শরিকরা জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জোর দাবি জানিয়েছে। তা না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এ অবস্থায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতির মারপ্যাঁচে কার্যত অনেকটাই হাবুডুবু খাচ্ছে জুলাই সনদ। শুধু তাই নয়, সরকার এবং বিরোধী দলের অনড় অবস্থানের কারণে জুলাই সনদ কী এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে হাঁটছে-এমন প্রশ্নও উঠছে। এ অবস্থায় গণভোটের ফলাফল হিসাবে এই সনদের ভবিষ্যৎ আসলে কি হবে-সেটি নিয়ে জনমনে নানা সংশয় যেমন দানা বাঁধছে, তেমনি বাড়ছে কৌতূহলও।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের প্রায় ১৮ মাসের মাথায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিন দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি সংসদ-সদস্য হিসাবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য। ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। তারা বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানে কিছু নেই। ভবিষ্যতে এটি যুক্ত হলে তখন শপথের বিষয়টি আসবে। এরপর থেকে জুলাই সনদ কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়।

এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক রোববার যুগান্তরকে বলেন, যে গণভোটের কথা বলে সংবিধানে পরিবর্তনের বা সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, এই গণভোট নিয়েই প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদের অনেক ধারা বা বিধান করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এখন সংবিধান পরিপন্থি কোনো সংশোধন তো সংসদ পাশ করতে পারে না। পাশ করলে এটা আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বাতিল হয়ে যাবে। শাহদীন আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার করার জন্য সংসদই যথেষ্ট। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব। এর জন্য আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এর আলোকে একই সঙ্গে নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এখন যদি কেউ বিষয়টিকে নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়, তাহলে তা হবে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

সূত্র জানায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের। এছাড়া বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই ভাবে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংবিধান সংস্কার, বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশি সংস্কার থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পুনর্গঠনসহ সব মিলিয়ে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই সনদের মাধ্যমে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোট রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ১৭টি বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছায়। তবে বাকি ৬৭টি প্রস্তাবে কোনো দল বা কেউ কেউ বিরোধিতা করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেন।

এদিকে জুলাই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ সময় ছিল রোববার। আদেশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি এই অধিবেশন আহ্বান করার কথা, কিন্তু সেটি হয়নি। বরং এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথের চিঠি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্দিষ্ট সংসদ সদস্যের শপথ পরিচালনা এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা এবং তফসিল প্রশ্নে রুল হয়েছে। পৃথক দুটি রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ৩ মার্চ পৃথক রুল দেন। বিবাদীদের ৪ সপ্তাহের মধ্যে পৃথক রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সূচনার দিনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংসদে বিক্ষোভ করেন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা। এমনকি তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট পর্যন্ত করেন। রোববার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের বৈঠকেও এ নিয়ে উত্তাপ ছড়ায়। অধিবেশনের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফ্লোর দেবেন বলে জানান। পরে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তার বক্তব্য খণ্ডন করে পালটা যুক্তি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। রোববার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যেভাবে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়, একই নিয়ম মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও প্রথম অধিবেশন ডাকার বিধান রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আজ (রোববার) সেই নির্ধারিত সময়ের ৩০তম দিন অতিবাহিত হচ্ছে, অথচ এখন পর্যন্ত এই পরিষদের কোনো অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। এটাই আমাদের কাছে উদ্বেগের বিষয়।

জবাবে সংবিধানে কোনো অস্তিত্ব না থাকায় রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে তিনি একথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব সংবিধানে নেই, তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন না। আর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতিও ওই অধিবেশন ডাকতে পারেন না। মূলত এ কারণেই রাষ্ট্রপতি কোনো অধিবেশন ডাকেননি।

এছাড়া এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে বক্তব্য তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন কার্যত ঝুলে যাচ্ছে। তারা আরও বলেন, এবার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সংস্কারের দাবি-দাওয়াও ছিল অনেক। স্বৈরতন্ত্র ঠেকানো ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন দাবিতে গঠিত হয় সংস্কার কমিশন। খাতওয়ারি আমূল পরিবর্তনের সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞরা। সেসব সুপারিশ তথা সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে বর্তমান সংসদের হাত ধরে। ফলে নতুন সংসদের গুরুত্ব অনেক বেশি।