দেশে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আবারও অস্থির হয়ে উঠছে ডলারের বাজার। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর ফলে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম প্রায় ১ টাকা বেড়েছে। একইসঙ্গে টাকার মানও কিছুটা দুর্বল হতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। সপ্তাহের শুরুতে এই হার ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ কয়েক দিনের মধ্যেই ডলারের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মানি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) অনেক এক্সচেঞ্জ হাউসে ডলারের দাম ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠতে দেখা গেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের মধ্যেও ডলারের দাম বাড়া বাজারে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই অনেক ব্যাংক এখন তুলনামূলক বেশি দামে ডলার লেনদেন করছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার প্রায় স্থিতিশীল ছিল। তবে মার্চে এসে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। ব্যাংকারদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তাই এর প্রধান কারণ।
এ প্রসঙ্গে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাংক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য অন্তত আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১১ মার্চ) আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৫৮ পয়সা, যা বৃহস্পতিবার বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৬৯ পয়সায়। এর আগে সোমবার ছিল ১২২ টাকা ৪৯ পয়সা এবং রোববার ১২২ টাকা ৪৩ পয়সা।
এলসি খোলায় বাড়তি চাপ
ডলারের দর বাড়ার প্রভাব আমদানিকারকদের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বাস্তবে এখনও ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়নি। তবে কিছু ব্যাংক ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে।
তার ভাষ্য, এলসি খোলার সময় কিছু ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা পর্যন্ত চাইছে। ফরওয়ার্ড সেল বা ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে এই দাম আরও বেশি রাখা হচ্ছে।
ফরওয়ার্ড ডলার সেল এমন একটি চুক্তি, যেখানে ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট তারিখে নির্ধারিত দামে ডলার বিক্রি করা হয়—সেই সময় বাজারদর যাই থাকুক না কেন।
ডলারের দাম বাড়াচ্ছে ব্যাংক
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম বাড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার এলসি সেটেলমেন্টে ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত নিয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৫–২০ পয়সা বেশি।
ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, সোমবার (৯ মার্চ) এলসি নিষ্পত্তির দর ছিল ১২২ টাকা ৫৭ থেকে ১২২ টাকা ৭২ পয়সা। এরও আগে গত সপ্তাহে এ হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ থেকে ১২২ টাকা ৩৫ পয়সা। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ডলারের দর ধীরে ধীরে বাড়ছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপের কর্মকর্তা বলেন, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলে। ডলার বাজার অস্থিতিশীল হলে আবারও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে ডলার বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। তবে রিজার্ভ ধরে রাখার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি কমাতে পারে—এমন বার্তা পাওয়ার পর ব্যাংকগুলো নিজেদের ডলার সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে এলসি নিষ্পত্তিতে কিছুটা বেশি দর চাওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকাররা মনে করেন, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাজারে অস্থিরতা এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন।
ব্যাংকভেদে ভিন্ন দর
বিভিন্ন ব্যাংকের ঘোষিত দরেও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ডলার বিক্রির জন্য দর নির্ধারণ করেছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৬৮ থেকে ১২১ টাকা ৮০ পয়সা।
বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক বিক্রির জন্য ১২২ টাকা ৯৫ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা দর নির্ধারণ করেছে।
ঢাকা ব্যাংক বিলস ফর কালেকশনের ক্ষেত্রে বিক্রির জন্য ১২২ টাকা ৯৯ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
অপরদিকে, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় এবং কিনেছে ১২১ টাকা ৬০ পয়সায়।
মতিউল হাসান আরও বলেন, সব ব্যাংকের কাছে সমানভাবে ডলার আসছে না। ফলে কিছু ব্যাংক নিজেদের দর সামান্য বাড়াতে পারে। তবে পরিস্থিতি এখনও খুব বেশি অস্থির হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। অর্থাৎ টাকার মান ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ডলারের দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।
একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনাও বন্ধ রেখেছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
চলতি অর্থবছরের ২ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার কিনেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪.২৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯.৫৭ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ বলেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক মাসের বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে। এলএনজি ও জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।
তার মতে, এই সম্ভাবনার কারণেই বাজারে ডলারের দাম বাড়ছে। ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং আগামী ছয় মাস ও এক বছরের জ্বালানি চাহিদা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। সেই ভিত্তিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থায়ন নেওয়া যেতে পারে।
বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
এই সময়ে রফতানি আয় কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আমদানি বাড়া এবং রফতানি কমার কারণেই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি
তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৫ দশকি ৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।
ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলারে, যেখানে আগের বছরে একই সময়ে তা ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
জাহিদ হোসেন বলেন, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবকে সুরক্ষা দিয়েছে। তবে বড় বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং রিজার্ভ সংরক্ষণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে, বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
তাদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।