Image description

২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফে র‌্যাবের মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ সভাপতি একরামুল হক। ঘটনার দিন তার স্ত্রী আয়েশা বেগমের প্রকাশ করা অডিও রেকর্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে দীর্ঘ নয় বছর পার হলেও এখনও মেলেনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার। বিচার না পাওয়ার বেদনার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকির মধ্যে দুই মেয়েকে নিয়ে অনিরাপত্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন আয়েশা বেগম। 

সীমাহীন কষ্ট, সামাজিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ঘটনার সাত বছর পর গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম। এটি এখনও তদন্তাধীন।

এসব নিয়ে আয়েশা বেগমের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের টেকনাফ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার দীর্ঘ সংগ্রাম, বেদনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অটল প্রত্যাশার কথা।

বাংলা ট্রিবিউন: নয় বছর ধরে বিচারহীনতার মধ্যে কেমন কাটছে দিন?

আয়েশা বেগম: গত নয় বছর আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। স্বামীকে হারানোর শোক তো আছেই, তার সঙ্গে দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে জীবন সামলানো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। প্রতিটি দিনই কষ্ট, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে। তবু আমি হাল ছাড়িনি। শুধু একটি আশাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, একদিন আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার হবে এবং আমরা ন্যায়বিচার পাবো।

 

0e0b7d1f-9375-4950-9d87-9c0f5a2a5c46একরামুল হকের কাদামাখা চশমা ও স্মৃতিচারণ করে এখনও কাঁদছেন স্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন: কেন আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে?

আয়েশা বেগম: প্রতিটি মুহূর্ত দুশ্চিন্তার মধ্যেই কাটছে। নয় বছরেও বিচার পাইনি। এর মধ্য সম্প্রতি নতুন করে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি পাচ্ছি, তাই দুই মেয়েকে নিয়ে খুব অনিরাপদ বোধ করছি। একপ্রকার তাদের নিয়ে হুমকিতে আছি। পাশাপাশি তাদের ভরণ-পোষণ চালাতেও অনেক কষ্ট হচ্ছে। স্বামীকে হারানোর পর আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও কোনও সহযোগিতা পাচ্ছি না। সবমিলিয়ে খুব কঠিন সময় পার করছি।’

বাংলা ট্রিবিউন: দুই মেয়েকে নিয়ে এই দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

আয়েশা বেগম: সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল দুই মেয়েকে বাবাহীন অবস্থায় বড় করে তোলা। বাবাকে হারানোর শোক ওদের ছোট মনেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ওরা বাবার খুব কাছের ছিল। এখনও বাবাকে খুঁজে, বাবার কথা বলে কান্না করে, নানা প্রশ্ন করে। কিন্তু অনেক সময় আমি কোনও উত্তর দিতে পারি না। তারপরও ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছি।’

বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে?

আয়েশা বেগম: ওই দিনের কথা মনে পড়লেই এখনও আমি ভেঙে পড়ি। সেই ভয়, আতঙ্ক আর অসহায় মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মনে হয় যেন ঘটনাটা এই সেদিন ঘটেছে। এমন একটি স্মৃতি কখনও ভোলার নয়। তার ওপর এত বছরেও বিচার না পাওয়ার বেদনা আমাকে আরও বেশি কষ্ট দেয়।’

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রকাশ করা অডিও রেকর্ড দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। তারপরও বিচার হয়নি কেন বলে মনে করেন?

আয়েশা বেগম: আমি সত্যটা মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলাম। দেশবাসী শুনেছে, জেনেছে, ঘটনাটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বিচার হয়নি এটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। আমার বিশ্বাস, তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার চাইলে এই হত্যার বিচার হতে পারতো। কিন্তু সেটি হয়নি। তাই আমার মনে হয়, সে সময় সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়নি।’

বাংলা ট্রিবিউন: নতুন করে তদন্তের দাবি কেন করছেন?

আয়েশা বেগম: আগের তদন্তে অনেক বিষয় সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি বলে আমাদের মনে হয়েছে। তাই আমি চাই নতুন করে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হোক, যাতে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়।

বাংলা ট্রিবিউন: আলোচিত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, এটিকে কীভাবে দেখছেন?

আয়েশা বেগম: এটাকে হয়তো বিচার প্রক্রিয়ার একটি শুরু বলা যায়। তবে পূর্ণাঙ্গ বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমি সন্তুষ্ট নই। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমার লড়াই চলবে। হত্যার সঙ্গে জড়িত অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছে বলেও শুনেছি। প্রয়োজনে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা হোক, এটাই আমাদের দাবি।’

বাংলা ট্রিবিউন: এত বছরেও বিচার না হওয়ার পেছনে কী কারণ দেখছেন?

আয়েশা বেগম: আমার বিশ্বাস, আগের আওয়ামী লীগ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই হত্যার বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও আমার অনেক আশা ছিল। কিন্তু সেখানেও আশানুরূপ অগ্রগতি দেখতে পাইনি। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। আমার মনে হয়, এই ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমার স্বামী নিজেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই কখনও কখনও মনে হয়, দলীয় পরিচয়ের ভেতরেই তিনি অবিচারের শিকার হয়েছেন।’

fce99379-6517-4997-833b-696f02d7ea78নিহত হওয়ার পর একরামুল হকের কাদামাখা চশমা উদ্ধার করা হয়েছিল

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

আয়েশা বেগম: এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা হারানো সন্তানদের কষ্ট ও একজন স্বামীহারা নারীর জীবনের সংগ্রাম উপলব্ধি করবেন। অন্তত বিএনপি সরকারের আমলে আমরা এই হত্যার বিচার পাবো, এই আশায় বেঁচে আছি। পাশাপাশি আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে আমাদের কথাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাবো।’

বাংলা ট্রিবিউন: এত বছর লড়াই চালিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে কে?

আয়েশা বেগম: আমার দুই মেয়েই। তারাই আমার শক্তি। ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই কখনও হাল ছাড়িনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। যদি বাংলাদেশে আইন থেকে থাকে নিশ্চিত আমি বিচার পাবো।’

বাংলা ট্রিবিউন: দেশের মানুষের কাছে আপনার বার্তা কী?

আয়েশা বেগম: সবাই যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে। আমার মতো আর কোনও পরিবার যেন বিচারহীনতার কষ্ট না পায়। সব হত্যার বিচার নিশ্চিত হোক, এটাই আমার চাওয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে ধন্যবাদ 

আয়েশা বেগম: বাংলা ট্রিবিউনকেও ধন্যবাদ