Image description
ইরানের পর মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ লেবাননেও হামলে পড়েছে ইসরায়েল। গত দুই দিনে দেশটিতে হামলায় নিহত হয়েছে অন্তত ৫২ জন। গতকাল রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এক ব্যক্তি। ছবি: এএফপি

ইরানজুড়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা হামলায় জবাব দিচ্ছে ইরান। নিজেদের ক্ষতি কমিয়ে আনতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে লোকজন সরিয়ে নিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। এ ছাড়া হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সৌদি আরব ও কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান।

এই পরিস্থিতিতে হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘ হতে পারে। তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করবেন না। স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। আর ইরান বলেছে, আগ্রাসন চলছে, তারাও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাবে।

ইরানে হামলার চতুর্থ দিন ছিল গতকাল মঙ্গলবার। এদিন পর্যন্ত হামলায় ইরানে নিহত হয়েছে ৭৮৭ জন। আর ইরানের হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০। এ ছাড়া ইরানে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি গতকাল জানিয়েছে, ইরানে এখন পর্যন্ত ১৫৩টি শহরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ৫০৪টি স্থানে ১ হাজার ৩৯টি হামলা হয়েছে।

হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর জবাব দেওয়া শুরু করে ইরান। মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে তারা। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক টুইটে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা ১৫টি দেশের ভূখণ্ড অথবা স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। দেশগুলো হলো ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান, ইরাক, বাহরাইন, ওমান, সিরিয়া, সাইপ্রাস, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাজ্য।

গতকাল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হামলা ছিল সৌদি আরবে। গতকাল ভোরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন হামলা হয়। এতে সীমিত মাত্রায় আগুন লাগে। পরে দেশটিতে দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া হামলার জেরে কুয়েতের দূতাবাসের কার্যক্রমও বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। গতকাল এ প্রসঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন থেকে সামরিক স্থাপনার বাইরেও হামলা হবে।

গতকাল ইরানের আইআরজিসি বাহরাইনে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে বলে ইরানি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে। মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে আইআরএনএ জানায়, আইআরজিসি ঘোষণা করেছে, তাদের নৌবাহিনী ভোরে বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় মার্কিন বিমানঘাঁটিতে বড় আকারের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে দাবি করা হয়, ২০টি ড্রোন ও ৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ঘাঁটিটির কমান্ড সদর দপ্তর ‘ধ্বংস করা হয়েছে’। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

বাহরাইনে সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ওমানের দুকুম বাণিজ্যিক বন্দরের একটি তেলের ট্যাংকারেও ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ওমান নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এতে সামান্য ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হয়নি। কুয়েত ও কাতারে হামলা চালিয়েছে ইরানের বাহিনী। এ ছাড়া হামলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আমিরাতজুড়ে ইরানের চালানো হামলায় এ পর্যন্ত ৩ জন নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছে। ইরানের ভেতরে চলমান অভিযানে অন্তত ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বোমা হামলা শুরুর পর এই প্রাণহানি ঘটে।

তবে প্রতিবেশী দেশে হামলা নিয়ে গতকাল কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ করছি না। আমরা আক্রমণ করছি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে। মার্কিন সেনারা পালিয়ে গিয়েও রেহাই পাবে না।’

এদিকে গতকাল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে সেটি হামলার শিকার হবে। গতকাল একটি তেলের ট্যাংকারে হামলাও চালিয়েছে তারা। এর জেরে তেলের দাম আরও বাড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়া হামলার নিরাপত্তা শঙ্কা থাকা আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।

ইরানের ক্ষতি ব্যাপক

ইরানজুড়ে গত সোমবার রাতে ও গতকাল দিনে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। আল জাজিরা জানায়, ইরানের রাজধানী তেহরানে মধ্যরাত থেকে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গত কয়েক রাতের তুলনায় সোমবার রাতের এই বোমাবর্ষণ ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। পুরো রাজধানীর আকাশে এখন শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। খবরে বলা হয়েছে, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের একটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি কমপ্লেক্সেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে টেলিভিশনটির সম্প্রচার এখনো অব্যাহত রয়েছে। শুধু তেহরানই নয়, কারাজ-কোমসহ ইরানের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও ব্যাপক বোমাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইরানে আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর কথা বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির অন্তত নয়টি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সংসদ সদস্য ফাতেমেহ মোহাম্মদ বেইগি। তিনি দেশটির সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিশনের সদস্য। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এসব কথা জানিয়েছে।

স্থল অভিযানের ইঙ্গিত

ইরানের ওপর শিগগির বড় ধরনের হামলার ঢেউ শুরু হতে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে দেশটিতে মার্কিন স্থল সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনো তাদের ওপর কঠোর আঘাত শুরুই করিনি। বড় হামলাটি আসতে দেরি আছে। আমাদের সামরিক বাহিনী ইরানকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।’ যুদ্ধের সম্ভাব্য সময়কাল নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই না এটি দীর্ঘস্থায়ী হোক। আমি সব সময় ভেবেছিলাম, এটি চার সপ্তাহ চলবে। তবে আমরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছি।’

তবে ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে এই অস্ত্রের প্রায় অসীম মজুত আছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রে সমৃদ্ধ এবং বড় বিজয় নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।’

নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, প্রয়োজনে ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টি তিনি বিবেচনায় রেখেছেন। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

তবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চায় না বলে জানিয়েছে। দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরান হামলার পর প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রতিক্রিয়া হবে চূড়ান্ত পর্যায়ের।

এ ছাড়া ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম। এখন তোমরা এমন একটি পথে যাত্রা শুরু করেছ, যার শেষ আর তোমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’

১৫ দেশ থেকে লোক সরানো হচ্ছে

এদিকে নিজ দেশের জনগণকে ‘শিগগির’ মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ এবং ফিলিস্তিন থেকে মার্কিনদের সরে যেতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও এক্সে দেওয়া পোস্টে এসব কথা বলা হয়। টাইম ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, যেসব দেশ থেকে মার্কিনদের সরে যেতে বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন (পশ্চিম তীর ও গাজা), জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, খুব দ্রুত কোনো বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবহার করে এসব এলাকা ত্যাগ করুন।

টাইম ম্যাগাজিন বলছে, গত শনিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত ১১ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের পরিষেবা স্থগিত করেছে। তবে সোমবার অল্প কয়েকটি ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ফিরে আসতে বললেও খুব বেশি ফ্লাইট পাওয়া যাচ্ছে না। ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাব অনুসারে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় হামলার আগে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬ লাখ মার্কিন ছিল। সে সংখ্যা কমেছে কি না, তা জানা যায়নি।