Image description
হরমুজ প্রণালি বন্ধ

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা এবং এর জবাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পালটা আক্রমণের মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস’র (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ ঘোষণা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো জাহাজ এটি অতিক্রম করার চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। এদিকে ইরানে হামলার কারণে এরই মধ্যে প্রণালির দুই পাশে প্রায় ৭০৬টি ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে ৩৩৪টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ, ১০৯টি ‘ডার্টি’ বা মিশ্রিত জ্বালানি পণ্যবাহী ট্যাংকার এবং ২৬৩টি ‘ক্লিন’ বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিবাহী জাহাজ। খবর রয়টার্স এনডিটিভির।

জেনারেল জাবারি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এই পথ অতিক্রম করার চেষ্টাকারী যে কোনো জাহাজে হামলা চালাব এবং আগুন ধরিয়ে দেব।’ আইআরজিসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে আরেক বার্তায় তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, ওই অঞ্চলের তেলের পাইপলাইনগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ইরান এই অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বাইরে যেতে দেবে না। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার পালটা জবাব হিসাবে ইরান এই কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে।

হরমুজ প্রণালি হলো পারস্য উপসাগরের একটি সরু প্রবেশপথ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহণ করা হয়। ইরান এই প্রণালির উত্তর দিকে অবস্থিত। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল ও গ্যাস নিয়ে ট্যাংকারগুলো এ পথ দিয়েই যাতায়াত করে। এই তেলের বেশির ভাগই যায় এশিয়ায়।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বিশ্ব তেল বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি করে। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিউবার্জার বারম্যান-এর সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া বলেন, এখানে ঝুঁকির মাত্রা কতখানি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, এক বা দুই সপ্তাহের আংশিক স্থবিরতা তেল কোম্পানিগুলো হয়তো সামলে নিতে পারবে। যদি এক মাস বা তার বেশি সময় এটি বন্ধ থাকে তবে অপরিশোধিত তেলের দাম (সোমবার ৭০ ডলারের আশপাশে ছিল) তিন অঙ্কের ঘরে (১০০ ডলারের ওপরে) পৌঁছে যাবে।

এদিকে এনডিটিভি সামুদ্রিক চলাচল বিশ্লেষণ সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড ও বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ১ মার্চ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে মাত্র তিনটি ট্যাংকার, যেগুলো বহন করছিল ২৮ লাখ ব্যারেল তেল। ২০২৬ সালের দৈনিক গড় ১ কোটি ৯৮ লাখ ব্যারেলের তুলনায় এটি ৮৬ শতাংশ কম। ২ মার্চের শুরুতে মূল নৌপথ দিয়ে গেছে কেবল একটি ছোট ট্যাংকার ও একটি ছোট কার্গো জাহাজ। প্রণালির দুই পাশে এখন প্রায় ৭০৬টি ট্যাংকার আটকে আছে। এর মধ্যে ৩৩৪টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ, ১০৯টি ‘ডার্টি’ বা মিশ্রিত জ্বালানি পণ্যবাহী ট্যাংকার এবং ২৬৩টি ‘ক্লিন’ বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিবাহী জাহাজ। আরও ২৬টি ট্যাংকার উপসাগরের ভেতরে স্পষ্ট গন্তব্য ছাড়া ভেসে আছে। ওমান উপসাগরেও শত শত জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে।

এই অচলাবস্থা কয়েক দিন স্থায়ী হলে ট্যাংকারের সারি আরও দীর্ঘ হবে। সরবরাহ সূচি ভেঙে পড়বে। উপসাগরীয় জলসীমায় যুদ্ধ ঝুঁকির বিমা ইতোমধ্যেই কঠোর হয়েছে। হরমুজের কাছে যেতে রাজি এমন জাহাজের ভাড়া ও অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাড়ছে। এর সব খরচ শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে যোগ হবে।

আর যদি এই পরিস্থিতি সপ্তাহজুড়ে চলতে থাকে, তাহলে পরিণতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এশিয়া ও ইউরোপের পরিশোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, ব্রাজিল ও রাশিয়া থেকে তেল আনার চেষ্টা চলছে। উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল চীন ও ভারত তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে পড়েছে।