ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মারাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শিগগিরই এ যুদ্ধ থামার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যবস্থার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। পুরো বিশ্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, সার্বভৌমত্ব কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে দেশে দেশে হামলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বেই শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে পারে। দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতকাল যে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে চর্চা হয়েছে সেটি আগামী দিনে ক্ষমতা, সামরিক ও পারমাণবিক শক্তির বিচারে নির্ধারিত হতে পারে। বদলে যেতে পারে পুরো পৃথিবীর চেহারা। ভেঙে পড়তে পারে বিশ্বব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বজুড়ে আঞ্চলিক, দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তার প্রশাসনের বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকটা খোলামেলাভাবেই ক্ষমতার চর্চা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মধ্যদিয়ে পুরো পৃথিবীর কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা ব্যবহারের চিত্র উঠে আসে। যার সর্বশেষ উদাহরণ ইরানে হামলা। নিরাপত্তার বড় হুমকি ঠেকাতে এ হামলা করার কথা বলা হলেও কার্যত এটি পুরো বিশ্বের কাছে ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে মার্কিন পরাশক্তিবিরোধী শক্তি চীন ও রাশিয়া কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করছে না। ঘটনার পর দেশ দুটির শীর্ষ নেতারা শুধু নানা বক্তব্য ও মন্তব্য করছেন।
বিশ্ব শাসনব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামীর বিশ্ব শাসনব্যবস্থা নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছেন। অবস্থা এমন যেন ‘জোর যার মুল্লুক তার’। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদেও বিশ্বব্যবস্থার ব্যতয় (অমান্য) করেছিলেন। নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরও তিনি আগের মতোই আচরণ করছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইউনেসকো, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ডব্লিউটিএ থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ তিনি দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি ত্যাগ করেছেন এবং সারা বিশ্বব্যবস্থা ওলট-পালট করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, কংগ্রেস বা সিনেট-কোনোটারই তিনি সম্মান দেখাননি, অনুসরণও করেননি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত শফিউল্লাহ বলেন, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে উঠানো হয়েছে-তা অকল্পনীয়। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীর সঙ্গে এমন ধরনের আচরণ-ভাবাই যায় না। সর্বশেষ ইরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেটিও বিশ্ব শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার ইঙ্গিত দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বকে যেন মধ্যযুগে নিয়ে যাচ্ছেন। কার্যত পুরো বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো এমন পরিস্থিতিতে তার আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের রোষানলের শিকার হতে পারে। একে অপরের প্রতি সম্মান রক্ষার জায়গায় চিড় ধরতে পারে।
এদিকে, বিশ্ব রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা অনেকেই মনে করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা শুধু একটি সামরিক আঘাত নয়। এটি ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ এবং বিশ্ব রাজনীতির পট-পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর (শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন) মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে পরিবর্তন আনতে চাইছে, সেটিতে তারা সফল না-ও হতে পারে।
রেডিও তেহরানের সাবেক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে বেআইনি ও অবৈধভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাকে হত্যার মধ্যদিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দৃশ্যপটে তারা থাকলেও পেছনে আরও অনেকে আছেন। কিন্তু এটি ভাবার কোনো কারণ নেই, ইরানের একজন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলেই ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বা বিপ্লবী সরকারের পতন হয়ে যাবে। কারণ ইরানের এ শাসনব্যবস্থার সঙ্গে দেশটির জনগণের সম্পর্ক। এর শেকড় অনেক গভীরে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিকল্প কে হতে পারেন সে প্রশ্নের আলোকে আমরা দেখি-ইরানে ইতোমধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সুপ্রিম লিডার (শীর্ষ ব্যক্তি) মারা যাওয়ার পর তিনজনের একটি পরিষদ সেখানে কাজ করছে। এটি হয়তো একটা সময়ের জন্য। এরপর তাদের সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করা হবে। সুপ্রিম লিডারকে নির্বাচন করবেন গার্ডিয়ান কাউন্সিল। এতে রাজতন্ত্র কাঠামোয় ফিরে যাওয়া সুযোগ একেবারেই নেই। ‘রেজিম’ পরিবর্তনের এজেন্ডা হয়ে থাকলে সেটি কার্যকরী হবে না।
এদিকে ইরানে হামলাসহ বিশ্বব্যবস্থার নানা ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সারা বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে হামলা-পালটা হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ জানালেও কার্যকর কিছু করতে পারছে না। তবে সংস্থাটি সব পক্ষকে সংযত থাকার এবং দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেছেন, যে কোনো যুদ্ধে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় মূল্য দেয়। তিনি বলেন, বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনো সমস্যার সমাধান নয়; এগুলো কেবল ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। সব পক্ষকে তিনি ‘যৌক্তিক ও বিবেচনাপ্রসূত আচরণ’ করার আহ্বান জানান। কিন্তু কার্যত জাতিসংঘের বলিষ্ঠ কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্বরাজনীতির বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ভেনিজুয়েলায় বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি যেভাবে তেল ও গ্যাস দখল করছে সেভাবে ইরানের তেল, গ্যাস ও অন্যান্য সম্পদ দখল না করা পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। আগামীতে একই ঘটনা বিশ্বের আরও অনেক দেশের সঙ্গেও হতে পারে।