Image description

ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা-পালটা হামলায় দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক রাজধানী দুবাইয়ে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে বসবাসরত প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তিরা এখন সপরিবারে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এখন তাদের কাছে বিমানের একটি টিকিট যেন সোনার হরিণ। বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় তাদের একমাত্র ভরসা এখন ব্যক্তিগত বিমান বা প্রাইভেট জেট। এই সুযোগে চার্টার্ড বিমানের ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ইস্তাম্বুল বা মস্কোগামী ছোট জেটের একেকটি সিটের ভাড়া কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

ধনকুবের, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও লাখো পর্যটকের প্রমোদকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত ঝলমলে দুবাই এখন চরম উৎকণ্ঠার শহর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে শুধু দুবাই-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান। ইরানের এ হামলায় দুবাই বিমানবন্দরের পাশাপাশি শহরের বেশ কিছু বিলাসবহুল হোটেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।

এ পরিস্থিতিতে দুবাই থেকে অনেকে পার্শ্ববর্তী ওমানের দিকে ছুটছেন। গাড়ি চালিয়ে ওমান যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। সেখানে এ পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব তেমনটা পড়েনি। ওমানের মাসকাট বিমানবন্দর এখনো চালু রয়েছে। তবে সেখানে ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা দেরি হচ্ছে।

বিভিন্ন অনলাইন টিকিট বুকিং সাইটের তথ্য অনুযায়ী, ওমানের মাসকাট থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের টিকিট চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে।

এদিকে মাসকাট থেকে প্রাইভেট জেটের ভাড়াও বেড়েছে অনেক। ব্যাপক চাহিদা ও অস্থিতিশীল এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিমানের অভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি। মাসকাটভিত্তিক প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ‘জেটভিআইপি’ গার্ডিয়ানকে জানায়, নেক্সট্যান্ট নামের খুব ছোট একটি জেটে করে ইস্তাম্বুল যাওয়ার খরচ এখন ৮৫ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা), যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিনগুণ। আবার মস্কোগামী প্রাইভেট চার্টার বিমানে একেকজন যাত্রীর সিটভাড়া পড়ছে ২০ হাজার ইউরো (প্রায় ২৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা)। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রাইভেট জেট কোম্পানি উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে।

রিয়াদ থেকে ইউরোপের ফ্লাইটের ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায়) গিয়ে ঠেকেছে। অস্ট্রিয়াভিত্তিক চার্টার প্রতিষ্ঠান অ্যালবাজেট জানিয়েছে, এখন খুব কম বিমানের সিটই ফাঁকা আছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য প্রায় ৯০ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা) ভাড়া চাইছে তারা। প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি জানান, বিমানসংক্রান্ত জটিলতা ও মালিকপক্ষের আপত্তিতে অনেক অপারেটর এখন ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাইছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও জোগানের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

আমিরাত ছাড়তে ইচ্ছুক অনেক যাত্রী ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে যাচ্ছেন। কারণ রিয়াদ বিমানবন্দর এখনো সচল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফোর তথ্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ‘এসইউভি’ গাড়ির বহর ভাড়া করছে। এসব গাড়িতে করে গ্রাহকদের রিয়াদে পৌঁছে দেওয়ার পর সেখান থেকে তারা প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ভিমানা প্রাইভেট জেটসের প্রধান নির্বাহী আমির ন্যারান বলেন, রিয়াদ থেকে ইউরোপের ফ্লাইটের ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায়) গিয়ে ঠেকেছে।

এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইতালিতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো সরকারি বিমানে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন। ইতালির শত শত নাগরিক দুবাইয়ে আটকা পড়ার সময় মন্ত্রীর এভাবে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর সময় ক্রোসেতো সপরিবার দুবাইয়ে অবকাশ যাপন করছিলেন। এ ঘটনায় রোমের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংঘাতের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন আগে থেকে সতর্ক ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। এমনকি তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সপরিবারে ফেরার পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মন্ত্রী একাই ইতালিতে ফিরেছেন। তার পরিবার এখনো দুবাই অবস্থান করছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিমানের খরচ তিনি নিজেই বহন করেছেন।

তবে বেশির ভাগ পর্যটকের জন্য এখন দুবাইয়ে অবস্থান করা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। দুবাই পর্যটন বোর্ড স্থানীয় হোটেলগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। ফ্লাইট জটিলতার কারণে যেসব পর্যটক আরব আমিরাত ছাড়তে পারছেন না, তাদের হোটেল থেকে বের না করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগের ভাড়াতেই তাদের থাকার মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে অনেক পর্যটক অনলাইনে অভিযোগ করেছেন, তাদের হয় বাড়তি টাকা দিতে বলা হচ্ছে অথবা রিসোর্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বন্দরগুলোও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার পশ্চিমা পর্যটক এখন মাঝসমুদ্রে প্রমোদতরিতে আটকা পড়েছেন। এ অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরের কাছে অন্তত ছয়টি বড় প্রমোদতরি নোঙর করেছে। এসব জাহাজের প্রতিটিতে হাজার হাজার যাত্রী আছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তাদের ব্যালকনিতে না গিয়ে নিজ নিজ কেবিনে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুবাইভিত্তিক আইনজীবী ইরিনা হিভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, দুবাইয়ে তার পরিচিতজনরা এখন তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম দল দ্রুত ওমান সীমান্তের দিকে ছুটছে। তাদের আশা, সেখান থেকে প্রাইভেট জেটে করে তারা ইস্তাম্বুলে যাবে। দ্বিতীয় দল জেদ ধরে আছে। তারা মনে করে, জীবন স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে। তারা সমুদ্রসৈকতে সাঁতার কাটা, পাম জুমেইরাহতে সূর্যাস্ত দেখা আর রোদে শরীর এলিয়ে দিয়ে সময় কাটাতেই বিশ্বাসী। তৃতীয় দল সম্পর্কে হিভার লিখেছেন, তারা ‘আশ্রয়স্থলে অবস্থানসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা’ পালন করবে।

সামগ্রিকভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অস্থিরতা দুবাইয়ের বিলাসী জীবনকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।