৩রা জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস কনফারেন্সটি আমি শুনেছি বুকের ভেতর টান নিয়ে। একজন ভেনেজুয়েলান বংশোদ্ভূত আমেরিকান হিসেবে আমি যা শুনলাম, তা ছিল একেবারে পরিষ্কার। আর সেই পরিষ্কার কথাগুলো ছিল শীতল, ভীতিকর। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বললেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘দেশটি চালাবে’ যতক্ষণ না তাদের মতে ‘নিরাপদ’ ও ‘বিবেচনাপ্রসূত’ একটি উত্তরণ ঘটে। তিনি বললেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার কথা, তাকে একটি মার্কিন সামরিক জাহাজে তোলার কথা, ভেনেজুয়েলাকে অস্থায়ীভাবে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে এনে শিল্প আবার ‘গড়ে তোলার’ কথা। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ওঠাতেই তিনি এমন একটি বাক্য বললেন, যা সবার জন্যই উদ্বেগজনক হওয়া উচিত: ‘তারা বোঝে এটি আমাদের গোলার্ধ।’
ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে এই কথাগুলো একটি দীর্ঘ, বেদনাদায়ক ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
চলুন, পরিষ্কার করে বলি প্রেসিডেন্ট যেসব দাবি করেছেন, সেগুলো কী। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার আছে একটি বৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা বিদেশি প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে মার্কিন ফৌজদারি আইনের আওতায় আটক করার। যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম দেশকে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই পরিচালনা করতে পারে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটনে বসে ঠিক করা যেতে পারে। তেল সম্পদ ও ‘পুনর্গঠন’-এর নিয়ন্ত্রণ হস্তক্ষেপের স্বাভাবিক ফল। এগুলোর কোনোটি করতে কংগ্রেসের অনুমোদন বা আসন্ন কোনো হুমকি প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
এ ধরনের ভাষা আমরা আগেও শুনেছি। ইরাকে প্রথমে ‘সীমিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘অস্থায়ী প্রশাসন’-এর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়ে উঠেছিল বছরের পর বছর দখলদারিত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দখল, আর পেছনে রেখে যাওয়া ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতা। স্টেওয়ার্ডশিপের নামে যা শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হয়েছিল আধিপত্যে। এখন ভেনেজুয়েলাকে নিয়েও একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘অস্থায়ী প্রশাসন’- শেষে হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্থায়ী বিপর্যয়।
আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রেস কনফারেন্সে বর্ণিত কোনো কিছুই বৈধ নয়। জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের হুমকি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দিতে ও নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়- তা সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। ‘একটি দেশ চালানোর’ অধিকার ঘোষণা করা মানে দখলদারিত্বের ভাষায় কথা বলা- যতই শব্দটা এড়িয়ে যাওয়া হোক।
মার্কিন আইনের ক্ষেত্রেও দাবিগুলো সমানভাবে উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কোনো অনুমোদন নেই, কোনো ঘোষণা নেই, এমন কিছুই নেই যা একজন নির্বাহীর হাতে ক্ষমতা দেয় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে বা কোনো দেশ পরিচালনা করতে। একে ‘আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ’ বলা মানেই তা বৈধ হয়ে যায় না। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেনি, কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির সতর্কতাও দেয়নি- যা বৈধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। দেশটির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই- না মার্কিন আইন অনুযায়ী, না আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে।
কিন্তু আইন বা নজিরের বাইরেও রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি: এই আগ্রাসনের খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার বোঝা সমানভাবে পড়ে না- তা গিয়ে আঘাত করে নারীদের, শিশুদের, বৃদ্ধদের, গরিবদের ওপর। এর মানে হলো ওষুধ ও খাবারের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ভাঙন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহারের বৃদ্ধি, আর অবরুদ্ধ জীবনে প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই। এর সঙ্গে যোগ হয় সেইসব মৃত্যু- যা অনিবার্য নয়, প্রাকৃতিকও নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহন, চিকিৎসা বা ওষুধের নাগাল ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটে। প্রতিটি উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে এবং বেসামরিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে- যেগুলোকে পরবর্তীতে ‘পার্শ্বক্ষয়’ বলা হয়, যদিও এসব ছিল আগে থেকেই অনুমেয় ও এড়ানো সম্ভব।
এটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে সেই অন্তর্নিহিত ধারণাটি যে, ভেনেজুয়েলাবাসীরা অপমান ও বলপ্রয়োগের মুখে নিশ্চুপ ও অনুগত থাকবে। এই ধারণাটি ভুল। যখন এটি ভেঙে পড়বে- যা অবশ্যম্ভাবী, তখন মূল্য দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাতের মাধ্যমে। যখন একটি দেশকে ‘উত্তরণ সমস্যা’ বা ‘প্রশাসনিক সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়- তখন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। জীবনগুলোকে হিসাবের খাতায় গ্রহণযোগ্য ক্ষতিতে পরিণত করা হয়। আর যে সহিংসতা পরে আসে, তাকে বলা হয় ‘দুঃখজনক পরিণতি’- অথচ সেটিই ছিল ঔদ্ধত্য ও জবরদস্তির পূর্বনির্ধারিত ফল।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যখন একটি দেশকে এমনভাবে বলতে শুনি- ‘পরিচালনা করা, স্থিতিশীল করা, আর শৃঙ্খলায় এলে হস্তান্তর করা’- তা আঘাত করে। অপমানিত করে এবং ক্রুদ্ধ করে।
হ্যাঁ- ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ নয়। কখনোই ছিল না। সরকার, অর্থনীতি, নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই আছে গভীর বিভাজন। কেউ নিজেকে চাভিস্তা হিসেবে চিহ্নিত করে, কেউ কঠোর বিরোধী, কেউ ক্লান্ত ও বিমুখ- এবং হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়তো উদযাপন করছে, ভেবে যে অবশেষে পরিবর্তন আসতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন দখলদারিত্বকে আমন্ত্রণ জানায় না।
লাতিন আমেরিকা এই যুক্তি আগেও দেখেছে। চিলিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ‘অচলাবস্থা’ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হুমকির অজুহাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের যুক্তি বানানো হয়েছিল- যার শেষ হয়েছিল গণতন্ত্রে নয়, বরং স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায়।
বাস্তবে, অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী- যারা সরকারের বিরোধী- তারাও এই মুহূর্তটিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা জানে বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘উত্তরণ’ গণতন্ত্র আনে না; বরং গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- নিখুঁত অবস্থান নয়। আপনি মাদুরোকে অপছন্দ করতেই পারেন, তবুও মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে পারেন। আপনি পরিবর্তন চাইতে পারেন, তবুও বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আপনি রাগান্বিত, ক্লান্ত বা আশাবাদী হতে পারেন, তবুও বলতে পারেন: অন্য দেশের শাসনের অধীনে থাকতে চাই না।
ভেনেজুয়েলা এমন এক দেশ, যেখানে কমিউনাল কাউন্সিল, শ্রমিক সংগঠন, পাড়াভিত্তিক কমিটি ও সামাজিক আন্দোলনগুলো তৈরি হয়েছে চাপের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক শিক্ষা এসেছে না থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক থেকে- এসেছে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে। এখন ভেনেজুয়েলাবাসীরা লুকিয়ে নেই, বরং ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কারণ তারা ধরণটি চিনে ফেলে। তারা জানে ‘উত্তরণ’ ও ‘অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ কথাগুলোর পর সাধারণত কী আসে। এবং তারা সবসময় যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে: ভয়কে রূপ দিচ্ছে সামষ্টিক কর্মে।
এই প্রেস কনফারেন্স শুধু ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে ছিল না, বরং ছিল এই প্রশ্ন নিয়ে: সাম্রাজ্য কি আবার প্রকাশ্যে বলতে পারে- অন্য দেশগুলোকে শাসনের অধিকার তার আছে এবং আশা করতে পারে বিশ্ব চুপ থাকবে?
যদি এটি টিকে যায় তাহলে বার্তাটি নির্মম:
সার্বভৌমত্ব শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গ্রহণযোগ্য’, আর গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল সাম্রাজ্যিক অনুমতিতে।
একজন ভেনেজুয়েলান-আমেরিকান হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করি।
আমি প্রত্যাখ্যান করি- আমার করের টাকা দিয়ে আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি। আমি প্রত্যাখ্যান করি- যুদ্ধ ও জবরদস্তিকে ‘ভেনেজুয়েলাবাসীর কল্যাণ’ বলে চালানোর মিথ্যা। এবং আমি নীরব থাকতে রাজি নই, যখন একটি প্রিয় দেশকে মানুষের সমাজ হিসেবে নয়, বরং মার্কিন স্বার্থের কাঁচামাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন কর্মকর্তা, কোনো করপোরেট বোর্ড, বা এমন কোনো প্রেসিডেন্টের হাতে নয়, যে মনে করে পুরো গোলার্ধ তার অধীনস্ত।
ভবিষ্যৎ কেবল ভেনেজুয়েলাবাসীর।
(লেখক কোডপিঙ্ক-এর লাতিন আমেরিকা ক্যাম্পেইনের সমন্বয়কারী। তিনি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিসের লা সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় (প্যারিস-৪) থেকে ভাষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকের পর তিনি কারাকাস ও প্যারিসের অফিস থেকে একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচিতে কাজ করেন এবং আবেদনকারীদের মূল্যায়ন ও নির্বাচন করার কাজে হাইতি, কিউবা, গাম্বিয়া ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয় তাকে। তার এ লেখাটি অনলাইন ভেনেজুয়েলা এনালাইসিস থেকে অনুবাদ)