বাংলাদেশে বেড়েই চলছে ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার। এর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ই-বর্জ্যের বাজারও। নষ্ট বা ফেলে দেওয়া ইলেকট্রিক পণ্য থেকে পাওয়া ই-বর্জ্যের বাজারের বার্ষিক আনুমানিক মূল্য ছয় হাজার কোটি টাকা। তবে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং না থাকায় এই খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের।
নষ্ট বা ফেলে দেওয়া মোবাইল, কম্পিউটার, ব্যাটারি, বাসায় ব্যবহৃত ইলেকট্রিক পণ্য ও ডিজিটাল ডিভাইস থেকে পাওয়া ই-বর্জ্য একদিকে বিশাল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। তবে, বিপরীতে রয়েছে ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত হুমকি। সঠিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থায় পরিবেশগত এই ঝুঁকি কাটিয়ে ই-বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও কাঠামোবদ্ধ ও জলবায়ু সহনশীল উপায়ে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে ব্যর্থ।
বাংলাদেশের মোবাইল আমদানিকারক সংস্থার (বিএমপিআইএ) তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশে সাড়ে তিন কোটি মোবাইল ফোন বিক্রি হয়, যা দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত চলে। এর মানে দাঁড়ায়, প্রতিবছর ৩০ লাখ মোবাইল ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।
এই খাতের শেয়ারহোল্ডারদের অনুমান, প্রতিমাসে ৫০০ কোটি টাকার ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন- ফোন, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, টেলিভিশন, প্রিন্টার ও এসিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস নষ্ট হয়। তবে, আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অচল বা ত্রুটিপূর্ণ ইলেকট্রিক পণ্যের পরিমাণ জানা যায়নি।
নষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ এসব পণ্য ই-বর্জ্য হিসেবে ধরা হয়। এসব ই-বর্জ্যে কপার, ব্রোঞ্জ, জিংক, স্বর্ণ, প্লাটিনাম, পালাডিয়াম ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক থাকে। বর্জ্য থেকে এসব মূল্যবান উপাদান দেশেই বের করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে।
ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হওয়া এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্রে যেমন মূল্যবান উপাদান রয়েছে, তেমনি সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ব্রোমিনযুক্ত ফ্লেম রিটার্ড্যান্টের মতো বিষাক্ত পদার্থও থাকে। এসব পদার্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে দূষিত হয় মাটি, জলাশয় ও ফসল।
গত অক্টোবরে ই-বর্জ্য শিল্পে যুক্ত থাকাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ওই সময় বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩৬৭ মিলিয়ন কেজি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যা প্রতিবছর ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ই-বর্জ্যের এক-তৃতীয়াংশ আসছে স্মার্ট ডিভাইস থেকে।
অক্টোবরে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর এক দশমিক ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইলেকট্রিক পণ্য বিক্রি হয়। যা থেকে প্রতিবছর দুই দশমিক ৮১ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ই-বর্জ্যের ভয়াবহ চিত্র। সংস্থাটির তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়। মাত্র তিন শতাংশ আনুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কেন্দ্রে যায়।
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, ২০২১ সালে বিপজ্জনক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা প্রণয়ন সত্ত্বেও তা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ভাঙেন। এতে শ্রমিকেরা বিশেষ করে নারীরা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে পড়ছেন।
সংস্থাটি বলছে, ৮৮ শতাংশ ভোক্তা সঠিকভাবে ই-বর্জ্য ফেলার পদ্ধতি জানেন না। আর ৭২ শতাংশ মানুষ নষ্ট ডিভাইস ঘরে রেখে দেন।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, সবশেষ তিন বছরের প্রতিটিতে সাত লাখ মার্কিন ডলারের আনুমানিক ১৫ হাজার টন করে ই-বর্জ্য রফতানি করা হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার ৪০ টন রফতানি করা হয়েছে পিআইসি সিস্টেমের আইন লঙ্ঘন করে। জলবায়ু ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও আইসি রফতানি করে যাচ্ছেন।
ই-বর্জ্যের পুনরাবর্তন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ডব্লিউইইই সোসাইটি বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি আক্তার উল আলমের মতে, দেশের প্রতি ব্যক্তি বছরে দুই দশমিক দুই কেজি ই-বর্জ্য উৎপাদন করেন। যদি সঠিকভাবে এসব বর্জ্য পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা যায় তাহলে বাঁচবে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা)। আক্তার উল আলম বলেন, ‘‘অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং পদ্ধতি মাটি, পানি ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষণ করছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে।’’
ডাব্লিউইইই সোসাইটির প্রেসিডেন্ট সুমন আহমেদ সাবির ই-বর্জ্য সংগ্রহের পদ্ধতিকে দুর্বল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘মূল্যবান উপাদান রফতানির মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। আর বাংলাদেশ পাচ্ছে ক্ষুদ্রতম অংশ।’’
আজিজু রিসাইকেলিং অ্যান্ড ই-ওয়েস্ট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক সাইদুর রহমান শাহীন বলেন, ‘‘প্রতিবছর যত মোবাইল ফোন ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হয় তার মাত্র ২০ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল করা প্রতিষ্ঠানের কাছে আসে। বেশিরভাগ ভোক্তা বারবার মোবাইল ঠিক করে কিংবা তা ঘরে রেখে দেয়। এর ফলে মার্কেটের সাপ্লাই চেইন প্রয়োজনীয় ই-বর্জ্য পায় না।’
সাইদুর রহমান শাহীন জানান, ফোন ভেঙে প্লাস্টিক, ধাতু ও আইসিতে ভাগ করা হয়। প্লাস্টিক শিল্পকারখানার চিপস হিসেবে বিক্রি হয়। আর ধাতু থেকে তামা, ব্রোঞ্জ, দস্তা, রুপা এবং উন্নত মানের বোর্ডে সোনা, প্লাটিনাম, প্যালাডিয়াম ও রোডিয়াম পাওয়া যায়।
টিআইবি বলছে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও বিটিআরসিসহ প্রধান সংস্থাগুলো ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিটিআরসিতে ১৪টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকলেও এর অর্ধেক নাকি ডিওইতে নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে, সম্ভাবনাময় ই-বর্জ্য খাতটি অর্থনৈতিকভাবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংকট আরও বাড়াচ্ছে। টিআইবির অনুমান, ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে সৌর প্যানেল থেকে ৫৫ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হবে। তবে, গত তিন অর্থবছরে আমদানি করা ১৬ হাজার ৭২৪টি বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কোনও স্পষ্ট কাঠামো নেই। এছাড়া, ভোটের জন্য আওয়ামী সরকারের আনা ইভিএম মেশিনেও ই-বর্জ্যের ঝুঁকি রয়েছে।
ই-বর্জ্য শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। ইপিআর বাস্তবায়ন, বাধ্যবাধকতা ও প্রণোদনা ছাড়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীরা খুব বেশি সামনে যেতে পারবেন না। জেআর রিসাইকেলিং সলুশনের এম এ হাসান জুয়েল বলেন, “বাংলাদেশের ই-বর্জ্যের বাজার নিয়ে সরকারের কার্যক্রম কাগজ-কলমে আটকে রয়েছে।” শাহীনের মন্তব্যে ইঙ্গিত দেয়, পরিবেশগত বিধি নিয়মিতভাবে উপেক্ষা করা কেবল বিচ্ছিন্ন ত্রুটি নয়, বরং এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।
ভাঙারিওয়ালা নামের একটি সংগঠনের পরিচালক ন্যাক হুদা বাংলাদেশের ই-বর্জ্যের বাজারের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বলেন, ‘‘বাণিজ্যিকভাবে এই মার্কেট বড় ও শক্ত হচ্ছে। কিন্তু কাঠামোগতভাবে দুর্বল। সংগঠিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, ইপিআর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি ছাড়া হাজার কোটি টাকার সুযোগ পরিবেশগত দায়েই থাকবে।”
ই-বর্জ্য নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা জরুরি বলে একমত বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আচরণগত পরিবর্তন ও সরকারের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এমনটি না করা গেলে ই-বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, “প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দ্রুত সমাধান না হলে এই বিষাক্ত বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।”