Image description

দীর্ঘ জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে এই প্রথম মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) জকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভোট গণনা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ওএমআর মেশিনে ভোট গণনার সময় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হওয়া গণনা কার্যক্রম কিছুক্ষণ পরই স্থগিত করা হয়। গণনা শুরুর পর দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যায় গরমিল ধরা পড়ায় ফলাফল নিশ্চিত করতে পুনরায় যাচাই শুরু করা হয়। তবে রাত ১২টা পর্যন্ত ভোট গণনা পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়নি।

জকসুর নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গণনা কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। মেশিনে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় তা সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। দুটি মেশিনে গণনার ফলাফল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সমস্যার উৎস দ্রুত জানানো হবে এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’

শীত উপেক্ষা করে ভোটে শিক্ষার্থীদের ঢল

মঙ্গলবারসকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় শেষ হয়। প্রথম জকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে নতুন দিনের সূচনা হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকেই কুয়াশামাখা শীত উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসেন। ভোট শুরুর আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন অনেকে।

ভোট দিতে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, জীবনের প্রথম জকসু নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে তারা উচ্ছ্বসিত। শুরুতে কিছু সংশয় থাকলেও সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মত দেন তারা।

দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা ভোটাররা

কুমিল্লা থেকে ভোট দিতে আসা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা আফরিন বলেন, ‘শীত উপেক্ষা করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছি। জীবনের প্রথম ভোট—ভালো লাগছে।’

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মুজাহিদ বলেন, ‘আজকের উপস্থিতিতেই বোঝা গেছে জকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোরসালিন আহমেদ বলেন, ‘যৌবনের প্রথম ভোট দিলাম জকসু নির্বাচনে। পরিবেশ মোটামুটি ভালো ছিল। এখন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে শেষ হলেই স্বস্তি।’

দিনভর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

দিনভর জকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ এবং ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান’ প্যানেলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে।

ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী এ কে এম রাকিব অভিযোগ করেন, প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট প্যানেলের পক্ষে কাজ করছে এবং বহিরাগত জড়ো হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে, শিবির প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভোট শুরুর পর থেকেই ধাক্কাধাক্কি করে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। বহিরাগত আনার অভিযোগও তোলেন তিনি।

এছাড়া বাম জোট সমর্থিত ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’ ও জাতীয় ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেলও অসৌজন্যমূলক আচরণ ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জানায়।

ভোট গণনায় কারচুপি নয়: শিবিরের হুঁশিয়ারি

ভোটগ্রহণ শেষে সংবাদ সম্মেলনে শিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ভোট গণনায় কোনও ধরনের কারচুপি মেনে নেওয়া হবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও কমিশনের স্বাক্ষরিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণনা করতে হবে।’

তিনি নারী ভোটার হেনস্তার অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দাবি করেন।

‘পক্ষপাতিত্বের’ অভিযোগ ঐক্যবদ্ধ জবিয়ানের

জাতীয় ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী কিশোর সাম্য নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। ভোটারদের হাতে দেওয়া কালি সহজেই উঠে যাওয়ায় ভোটের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে

নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাবে, জকসু নির্বাচনে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। কমিশনার ড. জুলফিকার মাহমুদ জানান, ৩৯টি কেন্দ্রের ১৭৮টি বুথে ভোটগ্রহণ হয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব সমন্বয়ের পর বিস্তারিত জানানো হবে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. সৈয়দা ইশরাত নাজিয়া বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি।’

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ইউটিএলের

ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) জবি শাখা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। সংগঠনটির দাবি, একটি প্যানেলের ভোটার স্লিপে প্রচারণামূলক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা।

উল্লেখ্য, এবারের জকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদে ১৫৭ জন ও হল সংসদে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার ছিলেন ১৬ হাজার ৭৩৫ জন এবং হল সংসদে ১ হাজার ২৪৭ জন।