১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সঙ্গে যোগ হয়েছে সংস্কার নিয়ে গণভোট। এই দুই ভোটের বাকি আর মাত্র ৩৬ দিন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল শঙ্কা বাড়াচ্ছে। এর বাইরে ফ্যাক্টর হতে পারে কালোটাকা, লুট হওয়া অস্ত্র ও কারাগার থেকে পালানো আসামিরা। এসব সমস্যা নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাঁরা এসব ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সশস্ত্র বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। বাড়ছে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা, হুমকি ও সংঘর্ষের আশঙ্কা। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ভোট কেন্দ্রগুলো সুরক্ষিত রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক সময়ে মব সন্ত্রাস বা দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গুজব, উসকানি বা রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংস আচরণ নির্বাচনকালীন পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি ভোটদানে আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দলও নির্বাচনের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সার্বিক নির্বাচনি পরিবেশ। বিভিন্ন দলের নির্বাচনি জোটের হিসাবকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে অনেক আসনে কোন্দল দেখা দিয়েছে। সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অনেক আসনে প্রায় প্রতিদিনই চলছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। বিভাজন তৈরি হচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বহিষ্কার ও শোকজও করা হয়েছে অনেককে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাইকমান্ড থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এদিকে সরকার নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এরই মধ্যে সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও এসপিদের আলাদাভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কালোটাকা, লুট হওয়া অস্ত্র ও কারাগার থেকে পালানো আসামিরা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সময় অর্থাৎ নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন সার্বিক পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এজন্য সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা যদি কার্যকরভাবে নেওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দলীয় কোন্দলের বিষয়টি যাঁরা দল পরিচালনা করেন তাঁদের ওপর বর্তায়। আইনশৃঙ্খলা ও মব সন্ত্রাসের বিষয়টি সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করি। এসব মোকাবিলা করতে সরকারের যে ধরনের দক্ষতা ও গোয়েন্দা নজরদারির প্রয়োজন, তা দেখতে পাচ্ছি না। দুটিতেই ঘাটতি রয়েছে। সময় খুবই কম। এর মধ্যেই এসব ঘাটতি সীমিত করে আনতে হবে। তিনি বলেন, এজন্য সরকারকে নতুন করে নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে ডায়নামিক সিকিউরিটি সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আইনের কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সচেতন নাগরিক ভূমিকার মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।