
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এ ধরনের তথ্য যদি শত্রুদের হাতে পড়ে, তাহলে তা কেবল জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গোপন আলোচনা ফাঁস হয়েছে। এনক্রিপ্টেড চ্যাট অ্যাপ ‘সিগনাল’-এ যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েমেনে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে একটি আলোচনার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। যদিও এটি শত্রুদের হাতে পড়েনি, তবে ঘটনাটি নজরে এসেছে প্রভাবশালী সাংবাদিক জেফরি গোল্ডবার্গের।
দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনের সম্পাদক গোল্ডবার্গ জানান, ভুলবশত তাকে এই গোপন গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করেন হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ওয়াল্টজ।
এই চ্যাট গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথসহ আরও অনেকে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘এই মেসেজ থ্রেডটি আসল বলেই মনে হচ্ছে।’
গোল্ডবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রুপে নীতিগত বিষয় থেকে শুরু করে সামরিক অভিযান সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা টিমের কাজের এক বিরল অভ্যন্তরীণ চিত্র তুলে ধরেছে।
গত ১৫ মার্চ যখন ইয়েমেনের হুথি টার্গেটে মার্কিন হামলা শুরু হয়, তখন চ্যাট গ্রুপে ওয়াল্টজ লিখেন, ‘অসাধারণ কাজ!’ এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা, একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত ও আগুনের ইমোজি পাঠান। অন্য কর্মকর্তারাও এতে সাড়া দেন।
কিন্তু এই সাফল্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন বহিরাগত এ ধরনের সংবেদনশীল চ্যাটে অনুপ্রবেশ করতে পারলে তা প্রশাসনের বড় ব্যর্থতা। আরও আশঙ্কার বিষয়, এ ধরনের আলোচনার জন্য সরকার নির্ধারিত সুরক্ষিত যোগাযোগ চ্যানেল ব্যবহার করা হয়নি, যা গুপ্তচরবৃত্তি আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ‘এই প্রশাসন গোপন তথ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বহীন আচরণ করছে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ক্রিস ডেলুজিও হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটিতে তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘন, এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করতে হবে।’
এ বিষয়ে রিপাবলিকান নেতারাও সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেসম্যান ডন বেকন বলেন, ‘এ ধরনের তথ্য অনিরাপদ প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করা উচিত হয়নি। রাশিয়া ও চীন অবশ্যই এসব মনিটর করছে।’
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়, আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে হলে ট্রাম্পের নিজ দলের সদস্যদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। তবে স্পিকার মাইক জনসন বিষয়টি বড় করে দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘হোয়াইট হাউস স্বীকার করেছে যে এটি একটি ভুল ছিল। তারা ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হবে।’
এদিকে, ট্রাম্প এই বিষয়ে অজ্ঞতার ভান করেছেন। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এই খবরের বিষয়ে কিছু জানতাম না।’
তবে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জাতীয় নিরাপত্তা টিম ও মাইকেল ওয়াল্টজের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনে গুঞ্জন রয়েছে, এ ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের পদত্যাগ আসতে পারে।
এদিকে, ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই গোপন চ্যাটের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ সদস্য ছিলেন। চ্যাটের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইয়েমেনে হামলাকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এর ফলে তেলমূল্য বাড়তে পারে এবং এটি ইউরোপের জন্য বড় হুমকি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন নয়।’ তবে তিনি একপর্যায়ে বলেন, ‘আমি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করব এবং আপাতত এই উদ্বেগ নিজেই রাখছি।’
এ ধরনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে আগে বিরোধ দেখা গেছে। যেমন, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ইরাক যুদ্ধের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।
এছাড়া, গোপন নথি ব্যবস্থাপনায় বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনই অফিস ছাড়ার পর গোপন নথি রাখার অভিযোগে তদন্তের মুখোমুখি হন। এমনকি ২০১৬ সালে, হিলারি ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভার ব্যবহারের ঘটনাও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল।
এবারও বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। খবর: বিবিসি