Image description

৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার নির্ধারণ করবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার বাকি সময়টায় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। এটা ট্রাম্পের হাতে থাকবে, নাকি বিরোধী পক্ষের হাতে চলে যাবে-তা নির্ধারিত হবে এই ভোটের মধ্য দিয়ে। ফলে ট্রাম্পের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ এই মধ্যবর্তী নির্বাচন। সূত্র : রয়টার্স, আলজাজিরা

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনব্যবস্থা ও নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতগুলো কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির হাতে কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নিয়ন্ত্রণ থাকবে, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এর দখল নেবেন? রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণে থাকলে ট্রাম্পের পক্ষে নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বা নীতি সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, সরকারি ব্যয় ও নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু করতে এবং অনেক নীতি আইন আকারে পাসে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ, অভিবাসননীতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো বড় ভূমিকা রাখছে। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা সমর্থন ট্রাম্পের দলের ফলাফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এমন বাস্তবতায় ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর তিনি কীভাবে দেশ চালাবেন এবং তাঁর প্রশাসনের কতটুকু প্রভাব থাকবে-তা এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি ৩৬ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন করবেন ভোটাররা।

মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৫১ আসন প্রয়োজন। বর্তমানে সিনেটে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ৫৩ সদস্য আছেন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য ৪৫ জন। কংগ্রেসের ৪৩৫ সদস্যের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য একটি দলকে ২১৮ আসনে জিততে হয়। বর্তমানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্য আছেন ২১৮ জন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যসংখ্যা ২১৪। এ ছাড়া একজন আছেন স্বতন্ত্র। এমন বাস্তবতায় ট্রাম্প নিজেকে দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভেবে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই একক সিদ্ধান্তে দেশ পরিচালনা করছেন। যেমন কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হলে কংগ্রেসের অনুমতি প্রয়োজন। ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই ইরানে প্রায় আট মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এ যুদ্ধকে ‘যুদ্ধ’ না বলে ‘অভিযান’ শব্দটি ব্যবহার করছেন স্রেফ কংগ্রেসের বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলার জন্য। এমনকি ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘গালফ অব আমেরিকা’ রেখেছেন তাঁর নির্বাহী আদেশে।

এমন পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রাণপণ চেষ্টা করছে তাদের প্রার্থীরা যেন এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিততে পারেন। তাঁরা যেন ট্রাম্পের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র বিরুদ্ধে সরব হতে পারেন। বিপরীতে ট্রাম্প চাচ্ছেন তাঁর দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আবারও কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখুন। কেননা কংগ্রেসে ট্রাম্পবিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করতে পারবেন। বলা বাহুল্য, ট্রাম্প চান না তাঁর পরবর্তী দুই বছরের শাসনামলে এমন ‘অনাকাক্সিক্ষত’ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে।

বিশ্লেষকদের মতে, সব মিলিয়ে বেশ ভয়ে আছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে মার্কিন বাজারেও। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও ধনী দেশটিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সেই কারণে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে ভোটাররা ট্রাম্প ও তাঁর দলের ওপর নাখোশ। ট্রাম্প বারবার কংগ্রেসকে এড়িয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁর নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাও ট্রাম্প ও ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড নিয়ে দলের নিষ্ক্রিয়তায় বিরক্ত। এ বাস্তবতায় ১৩ অক্টোবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিবেদনে জানায়, দেশটির ৬৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে অপছন্দ করছেন। পছন্দ করছেন ৩৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, ভোটের মাঠে সার্বিক অবস্থা ‘বেগতিক’ দেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জনপ্রতি ৫ হাজার ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ট্রাম্প কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে মরিয়া। কারণ তা না হলে ডেমোক্র্যাট-সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের হাতে তাঁর ‘বন্দি’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।