নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে গত জুন-জুলাইয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) নিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এবং এর জেরে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সে সময় অনশনে বসেছিলেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দীপকে। তবে তাদের সঙ্গে যন্তর মন্তরে অনশনে বসা আরেকজনের নামও সামনে আসে— নেহা বোরা।
টানা ২৩ দিনের সেই অনশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) এই পিএইচডি গবেষক ও বামপন্থী ছাত্রনেত্রী। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই নেহা বোরা আবারও রাজপথে। এবার ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে। গত ২ ও ৩ অক্টোবর দিল্লিতে এই দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের হাতে আটকও হন তিনি।
জেএনইউর এই পিএইচডি গবেষক একই সঙ্গে থিয়েটারকর্মী এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সর্বভারতীয় সভাপতিও।
তবে নেহার গল্পের একটি দিক অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। যে পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, সেখানে রাজনৈতিকভাবে তার নিজের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির কারণে ছোটবেলায় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে তাকে। পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল।
সেনা পরিবারের উঠান থেকে রাজনীতির ময়দানে
নেহার জন্ম উত্তরাখণ্ডের খতিমায়। বাবার সেনাবাহিনীর চাকরির কারণে তার শৈশব কেটেছে বিভিন্ন শহরে। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে দিল্লি পাবলিক স্কুলে পড়ার সময়ই শিল্প, বিতর্ক, জনসমক্ষে কথা বলা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোর প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
নিজের বক্তব্যে নেহা বলেছেন, উত্তরবঙ্গে কাটানো সময় তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। সেই সময় চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা ও অরুন্ধতী রায়ের লেখার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তবে বাম রাজনীতিতে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা আসে পরে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন নেহা। পরে দিল্লির ড. বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি জেএনইউর স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ নিয়ে পিএইচডি করছেন।
থিয়েটারের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু একাডেমিক নয়। জনসমক্ষে বক্তৃতা ও আন্দোলনে তার বক্তব্য উপস্থাপনের ধরনেও এর প্রভাব দেখা যায়। রাজনৈতিক বক্তব্যকে আবেগ ও গল্প বলার ভঙ্গিতে তুলে ধরার কারণে অন্য অনেক ছাত্রনেতার তুলনায় তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে যে কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ল
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন নেহা। শিক্ষা বেসরকারীকরণ, ফি বৃদ্ধি, পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার, এসব বিষয় তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল।
একপর্যায়ে তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি হন। এআইএসএ ভারতের একটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন, যা নকশালপন্থি দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের সঙ্গে যুক্ত।
জাতীয় সভাপতি হিসেবে নেহা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিষয়েই কথা বলেননি। গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এবং বিলকিস বানোর মামলার মতো বিভিন্ন বিষয়েও তিনি অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তার পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
অনশনে নেহা বোরা— ছবি: গৌরভ পান্ডেচলতি বছর ভারতে পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও কথিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে নেহা আবারও জাতীয় আলোচনায় আসেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া আন্দোলনে এআইএসএর নেতাদের সঙ্গে নেহাও যোগ দেন। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকও। নেহা, মনীশ কুমার ও আমিন আমিতোজ টানা ২৩ দিন অনশন করেন।
দীর্ঘ এই অনশন নেহাকে ভারতের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে। আন্দোলনের সময় তার সঙ্গে দেখা করতে যান অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও কৌতুকশিল্পী কুণাল কামরার মতো পরিচিত ব্যক্তিরাও।
মা-বাবার রাজনীতি একদিকে, নেহার পথ অন্যদিকে
নেহার রাজনৈতিক অবস্থান এবং পারিবারিক পরিবেশের এই বৈপরীত্যই তার গল্পের অন্যতম আলোচিত দিক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নিজের পরিবারেই বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং আমাদের বাড়িতে এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। আমি যখন থেকে দিল্লিতে এসেছি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছি, তখন থেকেই বাড়িতে এই মতপার্থক্য চলছে।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘অনেক সময় পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে আমার মনে হয়, আর্থিক বিষয় এবং নিজের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলাম এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পেরেছি। স্নাতক পড়াশোনার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষ থেকেই আমি এই স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, কারণ সেটাই ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।’
নেহা জানান, আন্দোলনের সময় তার বিজেপি-সমর্থক মা পুলিশের পদক্ষেপ দেখার পর আন্দোলনকারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছিলেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনে আসা কিছু বিজেপি-সমর্থক বাবা-মা ও বয়স্ক মানুষও শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন।
নেহার কাছে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে যখন সাধারণ মানুষ একটি আন্দোলনের দাবি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে শুরু করেন, তখনই একটি ছাত্র আন্দোলন বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
ককরোচদের সঙ্গে একই মঞ্চে
নেহার জাতীয় পরিচিতি বাড়ার আরেকটি কারণ ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপিকে ঘিরে তৈরি হওয়া আন্দোলন। অ্যাক্টিভিস্ট অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন পরে রাস্তায় প্রতিবাদের রূপ নেয়।
এআইএসএ এবং সিজেপির রাজনৈতিক পরিচয় এক নয়। তারপরও নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করেছে। এ বিষয়ে নেহার বক্তব্য, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে যে ইস্যুগুলোতে কাজ করা যায়, সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের পার্থক্য সহযোগিতার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়।
তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভবিষ্যতেও এআইএসএ সিজেপির সঙ্গে কাজ করবে কি না। নেহা বলেন, তারা মানুষের জন্য কাজ করলে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করবেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গেও নেহার সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। কে বেশি ‘ম্যাচিউর’, এমন বিতর্কে একজন ব্যবহারকারী নেহাকে দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান বলে মন্তব্য করেন। সেই পোস্টে দীপকে নিজেই সম্মতি জানান। পরে নেহা লেখেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’ জবাবে দীপক লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
উমর খালিদ প্রসঙ্গ
জন্তর মন্তরের নীট আন্দোলনের পর নেহা আলোচনায় এসেছিলেন ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে একটি ছাত্র বিক্ষোভে কালি ছোড়ার ঘটনায়। ৭ আগস্ট ঝাড়খণ্ড বিধানসভার কাছে ওই বিক্ষোভের সময় তার দিকে কালি ছোড়া হয়। ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে ১১ আগস্ট রাঁচির একটি আদালত তাকে জামিন দেয়।
আগস্টে ঝাড়খণ্ডে বিক্ষোভের সময় নেহার দিকে কালি ছোড়া হয়— সংগৃহীত ছবিএই ঘটনার পর নেহার উমর খালিদ-সংক্রান্ত বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় আসে।
জেএনইউর সাবেক ছাত্রনেতা উমর খালিদ ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার মামলায় কয়েক বছর ধরে হেফাজতে রয়েছেন। তার বিচার এখনো শুরু হয়নি। নেহা এ প্রসঙ্গে মূলত বিচারিক প্রক্রিয়া ও ‘ডিউ প্রসেস’-এর প্রশ্ন তুলেছেন।
তার বক্তব্যের সারকথা হলো, কোনো নাগরিককে গণমাধ্যম, জনতা বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের।
স্লোগানের ভেতর নিজের রাজনীতি খুঁজে নেওয়া
জেএনইউর ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ‘আজাদি’ স্লোগানের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন নেহা। তার কাছে ‘আজাদি’ একটি নারীবাদী স্লোগান এবং রাজনৈতিক স্লোগানের অর্থ তার ব্যবহার ও প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে।
নকশালবাড়ি প্রসঙ্গেও তার অবস্থান আলোচিত হয়েছে। সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু নকশালবাড়িকে দেখার পরিবর্তে তিনি ভূমি, শ্রম ও কৃষিশ্রমিকদের অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্নের সঙ্গে এই আন্দোলনের ইতিহাসকে যুক্ত করে দেখেছেন।
এই রাজনৈতিক অবস্থানই তাকে ভারতের বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির একজন দৃশ্যমান মুখে পরিণত করেছে।
রাজপথে বারবার ফিরে আসা এক তরুণ মুখ
উত্তরাখণ্ডের খতিমা থেকে দিল্লির রাজনীতির কেন্দ্র পর্যন্ত নেহা বোরার পথটা সরল ছিল না। সেনাবাহিনীর পরিবারের সন্তান হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে ওঠা, থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, জেএনইউতে গবেষণা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে তার বর্তমান পরিচয়।
৪ অক্টোবর দিল্লির বিক্ষোভস্থল থেকে নেহাকে আটক করে পুলিশ— টাইমস অব ইন্ডিয়াএকদিকে বিজেপি-সমর্থক পারিবারিক পরিবেশ, অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে জাতীয় নেতৃত্ব; একদিকে থিয়েটার ও একাডেমিক গবেষণা, অন্যদিকে রাস্তায় আন্দোলন ও দীর্ঘ অনশন—এই বৈপরীত্যগুলোই নেহা বোরাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
২৩ দিনের অনশন তাকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে অংশগ্রহণ তাকে নতুন রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর উমর খালিদ, ‘আজাদি’, জেএনইউ ও বাম রাজনীতি নিয়ে তার বক্তব্য তাকে আরও বিতর্কিত ও আলোচিত করেছে।
এখন নেহা বোরা আবার দিল্লিতে তার সমর্থকদের নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন।
এবার তিনি এবং তার সমর্থকেরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নেমেছেন। একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, দেশে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ব্রুট ইন্ডিয়া, বায়োগ্রাফি ইনসাইট, দ্য হিন্দু