Image description
নারী কর্মীদের সরিয়ে তাদের জায়গায় পুরুষ সহকর্মীদের দায়িত্ব দেয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পদ ছাড়ছেন আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসইটির প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক ব্রঁকো রুইভো। চলতি বছরের শেষেই তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন বলে জানিয়েছে আইফেল টাওয়ার অপারেটিং কোম্পানি (সেতে)।
 
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে সেতে জানায়, চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি দল আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে গেলে নারী কর্মীদের আড়ালে রাখার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হয়। ওই তদন্তের পরই প্যাট্রিক ব্রাঙ্কো রুইভোর পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে।
 
সেতে জানায়, তদন্তে সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন সফর ও পরিদর্শনের পরিকল্পনা এবং গত ৫ সেপ্টেম্বরের সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা ও ঘাটতি পাওয়া গেছে। এর ফলেই ওই দিন নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটি এ ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
 
 
নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার ঘটনায় আইফেল টাওয়ারের কর্মীরা একদিনের ধর্মঘট পালন করেন। এর ফলে ওই দিন স্থাপনাটি বন্ধ রাখতে হয়। কর্মীরা অভিযোগ করেন, কর্মক্ষেত্রে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যার কারণে শুধু নারী হওয়ার কারণে নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া, তাদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মী নিয়োগ এবং আড়ালে রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
 
কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন নারী কর্মীকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে সরে গিয়ে আলাদা কক্ষে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কোনো কোনো দায়িত্বে নারী কর্মীদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মীদের রাখা হয়। হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি দলটি আইফেল টাওয়ারে অবস্থান করার সময় সব নারী কর্মীকে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় যাতায়াত বা প্রবেশ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
 
এই ঘটনায় কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা সমতা ও বৈষম্যহীনতার মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মতে, আইফেল টাওয়ার ফ্রান্সের একটি প্রতীক। তাই এটি যে মূল্যবোধ ধারণ করে এবং কর্মীদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করে, সেখানেও তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত।
 
সেতে স্বীকার করেছে, হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন বোচাসনওয়াসি অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামিনারায়ণ সংস্থা—বিএপিএসের প্রতিনিধি দলটি নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত হয়নি।
 
ঘটনার পর বিএপিএসও দুঃখ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, এ ঘটনায় কারও কষ্ট বা অসুবিধা হয়ে থাকলে তারা তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।
 
আইফেল টাওয়ার পরিচালনার তত্ত্বাবধানে থাকা প্যারিস সিটি হলও এ ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছে। ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক সমতার নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করে।
 
বিএপিএস একটি রক্ষণশীল ধারার হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন। সমালোচকদের কেউ কেউ সংগঠনটিকে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় বা ‘সেক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্যারিসের পূর্বাঞ্চল বুসি-সাঁ-জর্জে সংগঠনটির ফ্রান্সের প্রথম ঐতিহ্যবাহী মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত কয়েক দিনের উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে সংগঠনটির সদস্যরা আইফেল টাওয়ার পরিদর্শন করেন।
 
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের প্রতিনিধি দলে কয়েকজন সন্ন্যাসী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনটির আধ্যাত্মিক নেতা ৯৩ বছর বয়সী মহন্ত স্বামী মহারাজ। তার ধর্মীয় ব্রত অনুযায়ী নারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের শারীরিক সংস্পর্শে আসা নিষিদ্ধ। এ কারণেই নারী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানায় সংগঠনটি।
 
প্যাট্রিক ব্রাঙ্কো রুইভো ফ্রান্সের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শ্রেণির জন্য পরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘একোল নাসিওনাল দ’আদমিনিস্ত্রাসিওঁ’(École Nationale d’Administration) এর সাবেক শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি প্যারিসের সাবেক মেয়র অ্যান ইদালগোর উপদেষ্টা হিসেবে সরকারি সেবা আধুনিকায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে তিনি আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সেতের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
 
নারী কর্মীদের সরিয়ে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর বছরের শেষে তার দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সেতে।