ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি সংলগ্ন এলাকায় আসলে কী ঘটছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে ঘাঁটির দিকে তিনটি সন্দেহভাজন সাদা ভ্যান যাওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হলেও তাদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পরপরই সেনা বোম্ব ডিসপোজাল দল রিমোট-কন্ট্রোল রোবট দিয়ে ভ্যানগুলোতে তল্লাশি চালায়। একইসঙ্গে ওই এলাকা সংলগ্ন হোয়েলফোর্ড গ্রামের ৮৫টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুরো ঘটনার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে তদন্তে নেমেছে যুক্তরাজ্যের কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ (সিটিপি)।
কী ঘটেছিল?
শনিবার রাত ১টা ৩৬ মিনিটে গ্লস্টারশায়ার পুলিশ খবর পায়, তিনটি সন্দেহভাজন গাড়ি ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির দিকে যাচ্ছে। রোববার ভোরে ঘাঁটি থেকে প্রায় দুই মাইল দক্ষিণ-পূর্বের হোয়েলফোর্ড গ্রামের কাছে পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রামের সন্দেহভাজন গাড়িগুলো পরীক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল পাঠানো হয়। গাড়িগুলোর চারপাশে ৪০০ মিটার এলাকা জুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
বিবিসি দাবি করেছে, কোনো আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াই এই অভিযান চালানো হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এই ঘাঁটির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানে বিমান হামলার জন্য মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো সম্প্রতি এই বিমান ঘাঁটিকে সহায়ক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তারা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
রোববার সকাল থেকেই এলাকায় বিপুলসংখ্যক জরুরি সেবা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আগামী কয়েক দিন এই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত চিফ কনস্টেবল ম্যাগি ব্লাইথ।
রোববার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে ম্যাগি ব্লাইথ জানান, স্থানীয় পুলিশ তদন্তে সন্ত্রাস দমন পুলিশকে পূর্ণ সহায়তা দেবে। অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড' হিসেবে ঘোষণা করার দায়িত্ব তিনি সন্ত্রাস দমন পুলিশের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
সন্দেহভাজনরা কারা?
বিস্ফোরক আইনের অধীনে প্রাথমিকভাবে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছিল।
পরে সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতির অভিযোগ যুক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আটক ব্যক্তিদের নাম ও জাতীয় পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ। তাদের কোথায় রাখা হয়েছে সেই তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাজ্যের ২০০০ সালের সন্ত্রাস দমন আইন অনুযায়ী কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন ছাড়াই সন্দেহভাজনদের ১৪ দিন পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখা যায়। সাধারণ মামলায় এই আটকের সময়সীমা থাকে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা।
পুলিশের দাবি, পুরো পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন আটক ব্যক্তিরা বড় ধরনের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন মার্কিন ও ব্রিটিশ নজরদারির ফলেই তাদের ধরা সম্ভব হয়েছে।
রানওয়ের ক্র্যাশ গেট ৬এ থেকে মাত্র ৩৫০ মিটার দূরে সন্দেহভাজনদের খালি গায়ে দাঁড়িয়ে থাকার একটি ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিটির অবস্থান পরীক্ষা করে সত্যতা পেয়েছে বিবিসি ভেরিফাই।
আটক করা তিনটি সাদা ভ্যানের গায়ে ‘ফুয়েল টু ইউ’ নামের লাল রঙের লোগো এবং একটি মোবাইল নম্বর দেখা গেছে। নম্বরে ফোন করলে সরাসরি স্বয়ংক্রিয় ভয়েস বার্তা শোনা যায়।
যুক্তরাজ্যে এই নামে কোনো বৈধ নিবন্ধিত জ্বালানি সরবরাহকারী কোম্পানির অস্তিত্ব নেই।
অনুরূপ নামের বৈধ প্রতিষ্ঠান ‘ফুয়েল টু ইউ’ (Fuel2U) জানিয়েছে এই ভ্যানগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তাদের আসল লোগো সবুজ রঙের এবং তাদের কোনো গাড়ি খোয়া যায়নি।
সূত্রপাত কীভাবে?
এক স্থানীয় নারী বাসিন্দার ৯৯৯ নম্বরে করা ফোনেই এই রহস্য প্রথম জনসমক্ষে আসে।
ওই নারী শনিবার রাতে বাড়ি ফেরার পথে ড্রাইভওয়েতে মুখোশ পরা একদল মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তাঁকে দেখেই মুখোশধারী ব্যক্তিরা পাশের মাঠ ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
ওই নারী প্রথমে ঘাঁটির প্রতিরক্ষা পুলিশকে ফোন করেন, কিন্তু সংযোগ পাননি। পরে রাত ১টা ৩৬ মিনিটে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন তিনি। ফোন করার ১০ মিনিটের মধ্যে সশস্ত্র পুলিশ এসে এলাকা ঘিরে ফেলে।
ওই নারীর সচেতনতার কারণেই বড় নাশকতার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জেফ মধ্যরাতে দরজার বাইরে চিৎকার শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, পুলিশ মানুষ আটক করছে।
ব্রিটিশ সরকার কী বলছে?
এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অপ্রমাণিত অনুমান না করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং দ্রুত পুলিশকে সতর্ক করায় সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই নাশকতার চেষ্টার পেছনে ইরানের কোনো হাত রয়েছে কি না, সেই বিষয়ে আগাম মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
ইরানের হুমকি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইরান ও তাদের ছায়াবাহিনী আমাদের ক্ষতি করতে চায় বলে আমরা জানি।’
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড কী কাজে ব্যবহৃত হয়?
কয়েক দশক ধরে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি মার্কিন বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এবং ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বিমানবাহিনী সরাসরি এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল।
২০০৩ সালে ইরাকে অভিযানের সময়ও ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমান আকাশে উড়েছিল।
ইরানের যুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকার সম্প্রতি মার্কিন বাহিনীকে এই ঘাঁটি ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি দিয়েছিল। গত ১ মার্চ এই ঘাঁটি থেকে ইরানে সামরিক হামলা চালানো হয়েছিল।
পুরো ঘটনার পেছনের আসল রহস্য এখনো সম্পূর্ণ অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। আটক পাঁচ ব্যক্তি আসলে কারা এবং তাদের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। ভ্যানগুলোতে আসলেই বিস্ফোরক ছিল কি না, কোনো বিদেশি শক্তির মদদ এর পেছনে কাজ করছিল কি না—এমন কোনো প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তের চূড়ান্ত অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে এই বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি