Image description

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একটি বড় ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। তাদের ভাষ্য, আলি তাহের রিজের নিচে বিস্তৃত দুটি সুড়ঙ্গসহ ওই বিশাল কমপ্লেক্স ধ্বংস করতে এক হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ধ্বংস করা সুড়ঙ্গ দুটির সম্মিলিত দৈর্ঘ্য দুই কিলোমিটারের বেশি। বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট কম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা ভূমিকম্পের মতো অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ফলে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ভূকম্পন সৃষ্টি হয়।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইডিএফের ভিডিও ও ছবিতে বিস্ফোরণের পর আকাশজুড়ে বিশাল আগুনের গোলা দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে।

নাবাতিয়েহ শহরের বাসিন্দা আহমেদ বলেন, বিস্ফোরণের প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর পুরো বাড়ি এমনভাবে কেঁপে ওঠে, যেন সত্যিই ভূমিকম্প হয়েছে। আতঙ্কে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসে; শিশুদের কান্না ও মানুষের চিৎকার শোনা যায়। অনেক গাড়ি এলাকা ছেড়ে বৈরুতের দিকে চলে যায়।

আলি তাহের রিজ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর সাইদাতেও বিস্ফোরণের কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

 

কী ছিল ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিতে

 

আইডিএফের দাবি, ভূগর্ভস্থ এই অবকাঠামোটি হিজবুল্লাহর বদর ইউনিটের একটি কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে কয়েক ডজন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন আকাশযান (ড্রোন) ছাড়াও ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মাইন ও বিস্ফোরক মজুত ছিল।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বলেছে, স্থাপনাটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। আইডিএফের দাবি, ইরানের অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় এটি গড়ে তোলা হয়। আইডিএফ আরো জানিয়েছে, স্থাপনাটির ভেতরে থাকা হিজবুল্লাহর সদস্যদের কেউ নিহত হয়েছেন, আবার কেউ পালিয়ে গেছেন। ইসরাইলি বাহিনীর ভাষ্য, এই স্থাপনা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর আটটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস এবং একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। তবে ইসরাইলের এসব দাবির বিষয়ে হিজবুল্লাহ কিংবা লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

 

দক্ষিণ লেবাননে ফের বেড়েছে উত্তেজনা

 

আলি তাহের রিজের নিয়ন্ত্রণ গত সপ্তাহে নেয় ইসরাইলি বাহিনী। কয়েক মাস ধরে সেখানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা।

মার্চে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করছে। ইসরাইল এই এলাকাকে সীমান্তসংলগ্ন ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করছে।

লেবাননের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ইসরাইলি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এবং টায়ার জেলার মানসুরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে লেবাননের সেনাবাহিনী তাদের মোতায়েন বাড়িয়েছে। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এমটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাবাতিয়েহেও সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।

 

সংঘাতের পটভূমি

 

গত ২ মার্চ ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে লেবাননও জড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়।

এর জবাবে ইসরাইল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে স্থল অভিযান চালায়। ইসরাইলি বাহিনী এখনো লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং একই সময়ে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি পৃথক সমঝোতার পর সংঘর্ষের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। ওই কাঠামোর আওতায় হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনীর ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি ওই চুক্তির অংশ ছিল না এবং তারা ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনাও প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলা ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলমান সংঘাতে দেশটিতে অন্তত ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৯৫ জন নারী ও ২৫৯ শিশু রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা ও কতজন বেসামরিক নাগরিক, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সংঘাতে দেশটির ৪০ সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

 

সূত্র: বিবিসি