Image description

দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। যাতায়াত, পণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ সবকিছুই নির্ভর করে গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনেরর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বলা হয়ে থাকে দেশের অর্থনীতির পাইপলাইন। কিন্তু সরকারের ছয় মাসের বেশি সময় পার হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কসহ দেশের যোগাযোগ ও গণপরিবহন খাতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। সড়কের বেহাল দশা, নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা, মেরামতে সময়ক্ষেপণ, যানজট, গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, পরিবহন খাতের বিনিয়োগ নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যর্থতায় রূপান্তরিত করেছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার, পরিকল্পনা ও দৃশ্যমান অগ্রগতির স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ এখনো নেয়া হচ্ছে না বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ছয় মাসে বিভিন্ন বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এলেও সড়ক-মহাসড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্বিঘœ করতে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, সড়কের পরিকল্পনা, নির্মাণের মান, রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনা করে নির্দিষ্ট মানদ- ও সময়সীমার মধ্যে মেরামতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা অপরিহার্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে গর্ত দেখা দিলে দ্রুত সংস্কার করা হয় না।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত শুক্রবার থেকে শুরু করে গতকাল রোববার পর্যন্ত যানজটে কাটেনি যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি। দুই থেকে তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগছে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা। টানা ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্থবির হাজারো যানবাহন। প্রচ- গরমে আটকে থেকে নাকাল নারী, শিশু ও বয়স্করা। এই ভোগান্তির সবচেয়ে করুণ পরিণতি হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যু। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার পথে দাউদকান্দিতে যানজটে আটকা পড়ে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী আমিরুন্নেছার অ্যাম্বুলেন্স। চার ঘণ্টা আটকে থাকার পর সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ খাতের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি তদারক করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং জনস্বার্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তবে ছয় মাসে সংস্কারের সূচনা করার মতো সময় হলেও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তেমন কোনো দায়িত্বশীল কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। যোগাযোগ খাতে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের পরও যদি মানুষের যাতায়াতের সময় না কমে, পরিবহন ব্যয় না কমে এবং সড়কের নিরাপত্তা ও মান উন্নত না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা নেই, বলছেন তারা।

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানি বা মালিকের বাস চলাচল করলেও কার্যকর রুট ব্যবস্থাপনা দেখা যায় না। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। উৎপাদনশীল পণ্যবাহী যানবাহন যানজটে আটকে থাকলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে গণপরিবহনের জ্বালানি খরচ বেশি হচ্ছে। চলমান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর যেসব প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দ্রুত শেষ করা। নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কের রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া। শিল্পকারখানার কাঁচামাল সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত পরিবহন করা না গেলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পকারখানায় উৎপাদিত পণ্য সময়মতো চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না, এতে পণ্যের শিপমেন্ট বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়Ñ এসব তথ্য জানিয়েছেন যোগাযোগ ও গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে চলা সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পের যেন শেষ নেই। সড়ক নির্মাণে যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা সেখানে নানা কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয়ও বাড়তে থাকে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গত কয়েক দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। মহাসড়ক সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, ফ্লাইওভার, বাইপাস, সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তনও এসেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে জেলা, জেলা থেকে উপজেলা ও আঞ্চলিক সড়ক বিভিন্ন জায়গায় সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কারণে বছরের পর বছর মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্ষাকালে কাদাপানি, পানিবদ্ধতা ও খানাখন্দ আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না।

এছাড়া যাত্রাবাড়ী এলাকায় হানিফ ফ্লাইওভারে যানবাহন ওঠার সংযোগস্থলেই দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। ফ্লাইওভারে ওঠার জন্য সড়কের যে অংশটুকু রাখা হয়েছে, তার বেশির ভাগই খানাখন্দে ভরা। বাস ও বড় যানবাহন ফ্লাইওভারে ওঠার সময় সমস্যা আরো বেশি হচ্ছে। যারা ফ্লাইওভার ব্যবহার করেন না, তাদের জন্য নিচের সড়কটি স্বাভাবিক রাখা দরকার। কিন্তু অনেক দিন ধরে এই রাস্তার অবস্থা একই রকম। ফ্লাইওভারের টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের কারসাজিতে নিচের রাস্তা মেরামত করা হয় না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন চালক। তারা বলছেন, নিচের রাস্তা খানাখন্দ থাকলে যানবাহনগুলো বাধ্য হয়ে ফ্লাইওভারে উঠবে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত ও ভাঙাচোরা রাস্তা যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করলেও দীর্ঘদিনেও কার্যকর সংস্কার না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনা। প্রতিদিন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, এশিয়ান হাইওয়ে, ৩০০ ফুট সড়ক এবং উপজেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে চলাচল করে হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, মোটরসাইকেল, সিএনজিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত যানবাহন। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হওয়া বড় বড় গর্ত, উঠে যাওয়া কার্পেটিং এখন জনদুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এসব সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিকল হয়ে পড়ছে যানবাহন। এতে মুহূর্তেই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। রাজধানীর প্রবেশ মুখে এ সড়কের বেহাল অবস্থা যান চলাচলে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটির প্রকল্পের যুগ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। এই সড়কে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা প্রবর্তনে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। বিআরটি প্রকল্প এখন ব্যর্থ প্রকল্প। এটিও এখন মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দফতর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ ইনকিলাবকে বলেন, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকলে বা দেশের রাস্তাগুলো দীর্ঘদিন ভাঙাচোরা থাকলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এটি স্বাভাবিক ঘটনা। আর আমাদেরও পরিবহন ব্যবসায় খরচ বেড়ে যায়। গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে। দেখা যায় একই দূরত্ব অতিক্রম করতে বেশি সময় লাগে। সরকারের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে দেশের অর্থনৈতিক মূল কাঠামোতে উন্নয়ন ঘটে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলছে একটি সেতুর সংস্কারকাজ। আর তাতেই থমকে গেল একটি মহাসড়ক। গত শুক্রবার থেকে শুরু করে গতকাল রোববার পর্যন্ত যানজট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। সোনারগাঁও, মেঘনা, গজারিয়া, দাউদকান্দি ও চান্দিনাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে যানবাহনের জটলা। ফলে কাটেনি যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি। দুই থেকে তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগছে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা। এই যানজট নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টার বেশি স্থবির হাজারো যানবাহন। প্রচ- গরমে খাবার পানি ছাড়া আটকে থেকে নাকাল নারী, শিশু ও বয়স্করা। কারো ফুরিয়ে যায় গাড়ির জ্বালানি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটিকে মাত্র ৯ বছরের মধ্যে মহাসড়কের ১৯২ কিলোমিটারের মধ্যে বড় ধরনের খরচ করা হয়েছে চার হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এ

কই দিন যানজটে আটকে থেকে মৃত্যু হয় ডা. মোজাম্মেল হক নামে আরো একজনের। একই দিনে দুজনের মৃত্যুর পর জনমনে প্রশ্নÑ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের পর কিছু দিন যেতে না যেতেই আবারো সড়ক সংস্কারের মতো ঘটনা কেন? অর্থনীতির লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে যাত্রী ও চালকদের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি বিপাকে পণ্য পরিবহন। পচনশীল কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও জরুরি সরবরাহ সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের আশঙ্কা, সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এই সড়কে ঢাকামুখী আনুমানিক ৮০০টি করে আপ-ডাউন মিলিয়ে এক হাজার ৬০০টিরও বেশি যাত্রীবাহী বাস আটকা পড়ে। বাসগুলোর ৫০ শতাংশ যাত্রী ধারণক্ষমতা বিবেচনায় প্রায় ২০ হাজার যাত্রী এই অচলাবস্থার ভুক্তভোগী বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ।
ফেনী থেকে ঢাকাগামী যাত্রী আনোয়ার হোসেন জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিন দিন তার পুরোনো রূপে ফিরে আসছে। যেখানে মহাসড়কের ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, সেখানে বরং এসব ক্ষেত্রে অবনতি হচ্ছে। যখনই বড় কোনো ছুটি পড়ে তখনই এসব সড়ক ও ব্রিজের মেরামতের কথা মনে পড়ে। আর ভোগান্তি দেয় হাজার হাজার যাত্রীকে। আজকে আমার অতিরিক্ত ১১ ঘণ্টাসহ যাত্রাপথে আটকে থাকা যাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত এই সময়ের মূল্য কে দেবে?

পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা পাঁচ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি গাড়িতে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা সরাসরি পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ক্ষতি ধরলে পাঁচ হাজার গাড়িতে পাঁচ কোটি, ১০ হাজারে ১০ কোটি, ১৫ হাজারে ১৫ কোটি এবং ২০ হাজার গাড়িতে ২০ কোটি টাকা ক্ষতি দাঁড়ায়। তবে এই টাকা চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার গুডস ট্্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ। প্রকৃত ক্ষতির মধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি, চালক-হেলপারের মজুরি ও ভাতা, ট্রিপ বাতিল বা বিলম্ব, গাড়ির পরিচালন ব্যয়, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং বন্দর ও অফডকে অতিরিক্ত বিলম্ব মাশুলও যুক্ত হবে।

বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন মালিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগ দাবি করেছেন। তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা ও প্রকৃত ক্ষতি জরিপের মাধ্যমে দ্রুত নিরূপণ করতে হবে, প্রাথমিক হিসাবে প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির জন্য ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও সরবরাহ চেইনে সৃষ্ট পরোক্ষ ক্ষতিও মূল্যায়ন করতে হবে।

কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সংস্কারকাজের আগে যানবাহনের চাপ বিবেচনা, বিকল্প চলাচল ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এমন অচলাবস্থা আরো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা যাত্রী ও চালকরা জানান, হঠাৎ করে যানজটে আটকে পড়ায় তাদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে যেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন। সেখানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসি রুমে বসে কি করেন? এই সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের জাতীয় মহাসড়কের যদি এ অবস্থা হয় তাহলে দেশ এগোবে কীভাবে? সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কাজটা কি? মন্ত্রীর কি শুধু এসির ভেতরে বসে থাকাটাই কাজ। আর দেশের জনগণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকবে। তিনি যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জানান।

ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় সউদী আরব প্রবাসী আমির হোসেন বলেন, বিকাল সাড়ে ৩টায় আমার ফ্লাইট। ভোর ৫টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা করি। সাত ঘণ্টায় ৮-১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি। এখন লাগেজ রেখে পাসপোর্ট নিয়ে মোটরসাইকেলে রওনা দিয়েছি। দেশের অন্যতম একটি মহাসড়কে এমন নৈরাজ্য মেনে নেয়া যায় না। কুমিল্লা থেকে ঢাকাগামী এশিয়া লাইন পরিবহনের যাত্রী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পূর্বঘোষণা ছাড়া এভাবে সংস্কারকাজ করা বেআইনি। আগে জানলে এভাবে রওনা দিতাম না। দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়া বিএনপির কাতার কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এম এম নূর বলেন, দাউদকান্দি থেকে মেঘনা ব্রিজ এলাকা মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে গেছে।

মালবাহী লরিচালক সুকুমার বলেন, কুমিল্লার আলেখারচর এলাকায় টানা প্রায় ১৫ দিন যানজটে ভুগেছেন। এখন আবার মহাসড়কের এই অংশে এসে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিনের পর দিন যানজটে আটকে থেকে চালকদের সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে যোগাযোগ মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জানান।
সওজের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আলরাজী রিয়ন জানান, বৃষ্টির কারণে সেতুতে তৈরি হওয়া গর্তটি মাইক্রো-কংক্রিট দিয়ে মেরামত করা হয়। কংক্রিট শক্ত হয়ে যান চলাচলের উপযোগী হতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হওয়ায় এ সময় লেনটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সোনারগাঁও, মেঘনা টোলপ্লাজা, গজারিয়া, পুরান বাউশিয়া, দাউদকান্দি টোলপ্লাজা, গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড ও চান্দিনা এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছে এবং কোথাও কোথাও জটলা তৈরি হয়েছে। যানবাহন চলাচল অব্যাহত আছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে প্রসারিত করার জন্য যেখানে যাকে দেশের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, সেটি করতে সরকার সক্ষম হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা ও সরকারের অর্থায়নে নেয়া প্রকল্পের প্রতিটি টাকা নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত নতুন নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন করা হবে। মহাসড়ক সংলগ্ন বাজার স্থানান্তর, আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থলে প্রয়োজনীয় ডাইভারশন নির্মাণ এবং সড়কে স্পষ্ট মার্কিং ও সাইনেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।