Image description

বিপর্যয়ের পর দুদিন কেটে গেছে। উত্তর নেপালের ভোতেকোশি নদীর দুই পাড় জুড়ে এখনো ধ্বংসের চিত্র মুছে ফেলা যায়নি। দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষদের উদ্ধার করতে এবং নিখোঁজদের সন্ধানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সে দেশের পুলিশ এবং সেনাবাহিনী। পুলিশ এবং সেনা মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার জনের একটি যৌথ বাহিনী নামিয়েছে নেপাল প্রশাসন। কিন্তু এর মধ্যেই নেপালে তৈরি হয়েছে নতুন আতঙ্ক। গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর এবার হিমবাহ ভেঙে তৈরি নতুন হ্রদেও পানি বাড়ছে। সেই পানি উপচে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীন হ্রদের কাছে পরিস্থিতি নজরদারি করতে সিসিটিভি বসিয়েছে।

নতুন আতঙ্ক, সতর্কতা

চীন সতর্ক করে বলেছে. ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদটির পানি উপচে পড়ার ‘উচ্চ ঝুঁকি’ রয়েছে। ভূমিধসে নেমে আসা মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় এই হ্রদ তৈরি হয়েছে। সেখানে পানি জমতে থাকায় হ্রদটির বাঁধের মতো অংশ ভেঙে হঠাত্ বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকির কারণে গতকাল শুক্রবার কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে আবার উদ্ধারকাজ শুরু হয়।

জানা গেছে, হিমবাহ ভেঙে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে তিব্বতের দুই নদী ছোকেন খোলা এবং পুরেপি সাংপোর সংযোগস্থলে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছিল। চীন জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের কারণে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সেই বিপর্যয়ের পর তুষার, পাথর, কাদামাটি পাহাড়ি নদীগুলোর খাতে এসে জমা হয়েছে। পাথর, কাদামাটি অনেক জায়গায় জমা হয়ে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করে দিয়েছে। অস্থায়ী বাঁধের মতো কাজ করছে সেগুলো। ফলে পানির চাপে বাঁধ ফেটে গেলে ফের পাথর, তুষার, কাদামাটি পাহাড়ি নদীগুলো ধরে নিম্ন অববাহিকায় নেমে আসতে পারে, হিমবাহ ধসের পর ভোতেকোশি নদীতে ঠিক যেমনটা হয়েছিল বুধবার।

চীনের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরে নেপাল পুলিশ আশঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, হ্রদের তীর ভেঙে বুধবারের চেয়েও বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। নেপাল পুলিশের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা পি চৌধুরী জানান, নদীর পানির স্তর বাড়ছে। তাই সবাইকে থামানো হয়েছে। যে গাড়িগুলো উদ্ধারকাজে গিয়েছিল, সেগুলো ফিরে আসছে। প্রত্যেককে নিচু এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হচ্ছে এবং নিরাপদ জায়গায় পাঠানো হচ্ছে। ফের আকস্মিক বন্যার আশঙ্কার মধ্যেই মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ।

লাশের সংখ্যা বেড়েই চলছে

 নেপাল সরকার গতকাল জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনের দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ এই সংখ্যক মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেড় হাজারের মতো মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের ৩২২ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৯০ মার্কিন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছে। ভয়াবহ বন্যায় আনুমানিক ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)।

মরদেহ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জিং

আকস্মিক বন্যায় স্রোতের তোড়ে অনেক মরদেহ ভেসে দূরের জেলাগুলোতে চলে গেছে। ফলে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে চিতওয়ানে ২২১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নওয়ালপরাসি পূর্ব এলাকা থেকে ১৩৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশে সাতটি মরদেহ ভেসে এসেছে। চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আরিয়াল বিবিসিকে বলেছেন, অনেক মরদেহের অবস্থা ভালো নেই। ফলে সেগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চিতওয়ান জেলায় সবমিলিয়ে সেখানে ৩০ থেকে ৫০টি দেহ একবারে সংরক্ষণ করা সম্ভব। সেগুলো আগেই ভরে গেছে। নতুন করে ঐ জেলাতেই উদ্ধার হয়েছে ১৩৭টি দেহ। কিছু পরিত্যক্ত ভবন শনাক্ত করে সেখানে অস্থায়ীভাবে আরো ২৫০ দেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন কর্তৃপক্ষ। যেখানে মর্গ উপচে পড়ছে, সেখান থেকে দেহ অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে। যদি অশনাক্ত দেহ সত্কারের মতো পরিস্থিতি আসে, তবে বিভিন্ন দিক থেকে দেহগুলোর ছবি, ভিডিও এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তবেই সত্কার করা হবে। নেপালের পোখরা অ্যাকাডেমি অব হেল্থ সায়েন্সের অধিকর্তা সুশীল আরিয়াল জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে মর্গে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ১০ থেকে ১৪ দিন রাখা যাবে। তারপর আর রাখা সম্ভব নয়। এই সময়ের মধ্যে পরিচিত কেউ এসে দেহ শনাক্ত না করলে দেহগুলো সত্কার করে ফেলতে হবে। সে ক্ষেত্রে অশনাক্ত দেহগুলোর গণসত্কার শুরু করবে নেপাল সরকার। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী আর বিকল্প উপায় নেই।