সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের (আইএসআইএল) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মূল ভূমিকায় থাকা কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের সঙ্গে হওয়া এক চুক্তির অংশ হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির প্রধান এ সিদ্ধান্ত জানান।
মঙ্গলবার দামেস্কের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসডিএফ নেতা মাজলুম আবদি বলেন, সিরীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে এসডিএফ পুরোপুরি একীভূত হয়েছে। এখন থেকে স্বাধীন কোনো বাহিনী হিসেবে এর আর কোনো কার্যক্রম থাকবে না।
একসময় সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিল কুর্দি নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীর হাতে। কিন্তু গত জানুয়ারিতে সরকারি বাহিনীর হামলায় তারা নিজেদের বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর তারা সরকারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে সিরিয়ায় কুর্দিদের সাংস্কৃতিক, নাগরিক ও শিক্ষার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
মাজলুম আবদি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। এর মাধ্যমে আমরা সিরিয়ার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাতা উল্টে দিলাম। আর শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠন নামের একটি নতুন পাতা খুলতে যাচ্ছি।’
এসডিএফ নেতা আরও বলেন, ‘আমরা চাই আজকের এই দিনটি একটি সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা হোক। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আমরা এখন বিনির্মাণের পথে যাব। আর অস্ত্রের যুগ পেরিয়ে আমরা শান্তির যুগে প্রবেশ করব।’
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় এসডিএফ একসময় সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তখন আল-শারার নেতৃত্বাধীন দামেস্কের নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে ওয়াশিংটন।
‘সিরিয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত’
দামেস্ক থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হেইডি পেট বলেন, এসডিএফ বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনাটি ‘সিরিয়ার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত’। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন আল-শারা সরকারকে সমর্থন দেওয়ায় এসডিএফের নিয়তি বদলে যায়। এসডিএফের ভারী অস্ত্রগুলো কী হবে এবং ওয়াইপিজের নারী যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে—এসব প্রশ্নের সমাধান না হওয়ায় একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় সাত মাসের বেশি সময় লেগেছে।
হেইডি আরও বলেন, ‘ওয়াইপিজে যুক্তি দিয়েছিল যে তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া উচিত। কারণ, তারা পেশাদার সেনাসদস্য। তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং ভবিষ্যতেও সেনাসদস্য হিসেবেই কাজ চালিয়ে যেতে চায়।’
আল–জাজিরার এই প্রতিবেদক বলেন, ‘দামেস্ক সরকার তাদের কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল। এই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কারণেই এত দিন আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।’
হেইডি পেট আরও বলেন, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আসাদ পরিবারের ৫০ বছরের শাসনামলে কুর্দিরা সব সময় অবহেলিত ছিল। এমনকি তাদের অনেককে নাগরিকত্বও দেওয়া হয়নি।
দামেস্কে দেওয়া বক্তব্যে মাজলুম আবদি জোর দিয়ে বলেন, আল-শারা সরকার কুর্দি ভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিতে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, চলতি বছর থেকেই কুর্দি ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালুর জন্য তাঁরা কাজ করবেন।
‘সুদূরপ্রসারী প্রভাব’
এদিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসডিএফের এই বিলুপ্তি একটি ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া গড়ার পথ তৈরি করতে সাহায্য করবে।
সিরীয়-বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ও লেখক সালেহ মুবারক বলেন, ‘আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে সংঘাত এড়ানোর পথ খোঁজার জন্য আমি উভয় পক্ষকে, বিশেষ করে সরকারকে সাধুবাদ জানাই।’
আল–জাজিরাকে সালেহ বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে ‘দক্ষিণ এবং সম্ভবত পশ্চিমের অন্য বিদ্রোহীদের ওপরও একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। তারা বুঝতে পারবে যে সিরিয়া একটি অখণ্ড দেশ হিসেবেই থাকবে। ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা ও বর্ণের দিক থেকে আমাদের যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা স্বীকৃতি পাবে এবং উদ্যাপিত হবে।’
তবে এই বিশ্লেষক বলেন, আল-শারা সরকার ভাষার অধিকারসহ কুর্দিদের নানা অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তা ‘এখন পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’।
এরপরও সালেহ বলেন, ‘কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই চুক্তিটি যে এই পর্যায় পর্যন্ত এসেছে, সেই দিক থেকে অবশ্যই এটি উদ্যাপনের দাবি রাখে।’
যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে তাদের ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঠিক এক দিন পরই এসডিএফের বিলুপ্তির ঘটনা ঘটল। সিরিয়ার ওপর কয়েক দশক ধরে এই তকমা লাগানো ছিল, যার কারণে দেশটিকে কঠিন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছিল।
আল-আসাদের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
প্রেসিডেন্ট শারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সিরিয়া একটি কালো অধ্যায় থেকে বেরিয়ে এসেছে। দেশটি এখন উন্নয়ন, পুনর্গঠন এবং নতুন করে গড়ে ওঠার পথে অতীতের একটি যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় পেছনে ফেলল।’