ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র অস্ট্রিয়ায় ইসলাম আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা। খ্রিস্টধর্মের পর দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে ইসলাম ক্রমশ শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। অভিবাসন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে অস্ট্রিয়ার মুসলিম সমাজ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, হিজাব এবং রাজনৈতিক নীতিমালা ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।
অস্ট্রিয়ায় মুসলিম জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি
অস্ট্রিয়ান কাউন্সিল অব সায়েন্সেসের ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অস্ট্রিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এ হিসেবে খ্রিস্টধর্মের পর ইসলাম দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম।
বর্তমানে মুসলিমরা অস্ট্রিয়ার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দিন দিন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
ইতিহাসের পথ ধরে ইসলামের আগমন
অস্ট্রিয়ায় ইসলামের ইতিহাস আধুনিক অভিবাসনের চেয়েও পুরোনো। ১৯০৮ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করলে বিপুলসংখ্যক মুসলিম এই রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়ে যায়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯১২ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
অভিবাসনের ঢেউয়ে মুসলিম সমাজের সম্প্রসারণ
অস্ট্রিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অধ্যায় শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে। সে সময় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তুরস্ক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক অস্ট্রিয়ায় অভিবাসন করেন।
পরবর্তী কয়েক দশকে এই অভিবাসীরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে মুসলিম জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আজ তাদের উত্তরসূরিরা অস্ট্রিয়ার সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।
মুসলিমদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব
বর্তমানে অস্ট্রিয়ার মুসলিমদের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি অব অস্ট্রিয়া’।
এই প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে ২৫০টিরও বেশি ইসলামী সোসাইটি ও মসজিদের কার্যক্রম তদারকি করে এবং মুসলিমদের ধর্মীয় ও আইনি অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অস্ট্রিয়ার মূলধারার রাজনীতিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজনীতিক মুনা দুজদার দেশটির ফেডারেল সরকারে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন অস্ট্রিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম মুসলিম সদস্যদের অন্যতম।
হিজাব নিষেধাজ্ঞা: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
২০১৯ সালের মে মাসে অস্ট্রিয়ার পার্লামেন্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য হিজাব বা স্কার্ফ পরা নিষিদ্ধ করে একটি আইন পাস করে।
আইন অমান্য করলে কিছু অঞ্চলে অভিভাবকদের জন্য সর্বোচ্চ ৪৪০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়। এই সিদ্ধান্ত দেশটির মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
সমালোচকদের মতে, ইহুদি বা শিখ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রতীককে এই আইনের আওতার বাইরে রেখে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়কেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
তবে সরকারি পরিচয়পত্রের ছবিতে মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখা গেলে হিজাব পরার অনুমতি বহাল রাখা হয়।
নতুন আইন ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিজাব ইস্যু অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে দেশটির সরকার ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার একটি নতুন আইনের অনুমোদন দেয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আবারও ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।
রাজনৈতিক চাপ ও মুসলিম সমাজের উদ্বেগ
অস্ট্রিয়ার পিপলস পার্টি এবং ডানপন্থী ফ্রিডম পার্টির জোট সরকারের সময় মুসলিমদের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
হিজাব নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন নীতিমালাকে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর চাপ হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে পিপলস পার্টি ও গ্রিন পার্টির জোট সরকার ক্ষমতায় এলেও হিজাব-সংক্রান্ত নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বরং বিদ্যালয়ে হিজাব বা স্কার্ফ নিষিদ্ধের বয়সসীমা ১৪ বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তৎকালীন রক্ষণশীল চ্যান্সেলর সেবাস্টিয়ান কুর্ৎস এসব পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডানপন্থী ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল হিসেবেই এসব নীতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
অস্ট্রিয়ায় ইসলামের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, অভিবাসন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিমরা দেশটির উন্নয়ন ও বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছেন।
তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, হিজাব এবং রাজনৈতিক নীতিমালা ঘিরে নতুন নতুন বিতর্কও সামনে এসেছে। একদিকে মুসলিম সমাজ তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সমসাময়িক ইউরোপীয় সমাজের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করছে।
অস্ট্রিয়ার মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর।
সূত্র : ই-হালাল ডট আইও