বছরের পর বছর ধরে চলছে বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ। কিন্তু ফুরাচ্ছে না বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আলিন্দে কান পাতলেই শোনা যায়, ন্যায়বিচারের আশায় দিন গুনতে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে মামলার পাহাড়, অথচ সেই তুলনায় থমকে আছে বিচারকের সংখ্যা। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার যেন এক সুদূরপরাহত স্বপ্ন।
মামলাজটের পরিসংখ্যানের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০১০-এর তুলনায় ২০২৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে বিচারক বেড়েছে মাত্র ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
উদ্বেগজনক চিত্র আপিল বিভাগেও। সেখানে ১৫ বছরে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে প্রায় ৩৫৪ শতাংশ। অথচ বিচারকের সংখ্যা বাড়ার বদলে উল্টো কমেছে ২৫ শতাংশ।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য বলছে, ২০১০ সালে হাইকোর্টে বিচারক ছিলেন ৯৪ জন। তখন বিচারাধীন মামলা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৩৫টি। সে বছর নিষ্পত্তি হয় ৬৯ হাজার ৩০৬টি মামলা। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে হাইকোর্টে বিচারকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৭ জনে। কিন্তু বিচারাধীন মামলার সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৬টিতে। অর্থাৎ ১৫ বছরে মামলা বেড়েছে প্রায় ১১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু বিচারক বেড়েছে মাত্র ১৩ জন।
অন্যদিকে, ২০১০ সালে আপিল বিভাগে বিচারক ছিলেন আটজন। তখন বিচারাধীন মামলা ছিল ৯ হাজার ১৪১টি। নিষ্পত্তি হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৩টি মামলা। ২০২৫ সালের শেষে আপিল বিভাগের বিচারক কমে দাঁড়ান মাত্র ছয়জনে। অথচ বিচারাধীন মামলা বেড়ে হয় ৪১ হাজার ৫৫১টি। অর্থাৎ মামলা বাড়ে প্রায় ৩৫৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
অবশ্য বিচারক কমলেও আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭ হাজার ৫৫৩টি মামলা। এটি ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে উচ্চ আদালতের দুই বিভাগে কর্মরত মোট ১১৩ জন বিচারক। বিপরীতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭ লাখ ৮০৭টি। অর্থাৎ বিচারকপ্রতি মামলা ৬ হাজার ২০২টি। যে চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
আইনজীবী ও আইনজ্ঞদের মতে, মামলার সংখ্যা বাড়ার তুলনায় বিচারক নিয়োগ না বাড়ানো, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘসূত্রতা— এসব কারণে বিচারজটও বাড়ছে ক্রমেই। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, আদালত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যকর করা জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘যখন জনসংখ্যা বাড়ছে, মামলার সংখ্যা বাড়ছে, সেক্ষেত্রে আদালতের সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন প্র্যাকটিক্যালি (বাস্তবিকই)। সেজন্য আমি মনে করি, দ্রুত জজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন। তাতে করে মামলা নিষ্পত্তি দ্রুততার সঙ্গে হবে।’
নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর উচ্চ আদালতে আসা ডেথ রেফারেন্সগুলো বছর ক্রমান্বয়ে শুনানি হয়ে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা থেকে জানা যায় যে, হাইকোর্টে পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় ২০২৬ সালে এসেও ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক ও পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রার্থীদের মনে তৈরি করছে হতাশা।
দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা কিছু অপরাধের ঘটনা গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেলে অনেক সময় সরকার উদ্যোগ নেয় দ্রুত বিচারের। সেসব মামলায় আসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায়ও। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামির রায় কার্যকর করতে লাগে হাইকোর্টেরে অনুমোদন। পাশাপাশি আসামিরা আপিল আবেদনও করে থাকেন। অনুমোদনের জন্য আসা ডেথ রেফারেন্স ও আপিল আবেদনগুলো শুনানি করা হয় বছর ক্রমান্বয়ে। কিন্তু পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় এসব মামলার দ্রুত শুনানি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিচারও দৃশ্যমান হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপনে তুলে ধরলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারকস্বল্পতার চিত্র। বললেন, ‘আগে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ বিচারকাজ চালাত। বিচারপতির স্বল্পতার কারণে পরে দুটি বেঞ্চ হয়েছে। আরও স্বল্পতার কারণে এখন একটা বেঞ্চ চলছে। আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ না দেওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে।’
সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বিচারপতিস্বল্পতার জন্য অনেক সময় নিরপরাধীকেও থাকতে হচ্ছে জেলে। তিনি বললেন, ‘অনেকের জামিন হয় হাইকোর্টে। কিন্তু চেম্বার বিচারপতি যদি সে আদেশ স্থগিত করে দেন, তাহলে সেটা সাত বা আট বছরেও নিষ্পত্তি হয় না। যে অপরাধী সে জেলে থাকবে। কিন্তু যে নিরপরাধী সে কেন জেলে থাকবে? একটা মানুষকে জেলে থাকতে হচ্ছে আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য, বিচারপতিস্বল্পতার জন্য। পাশাপাশি হাইকোর্টেও বিচারক কম। বেঞ্চ কম। মানুষ বিচারপ্রার্থী হতে পারছে না সর্বোচ্চ আদালতে।’
বিচারকস্বল্পতার কারণে দিনের পর দিন মামলার শুনানি করতে না পারা ন্যায়বিচারের পথে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন এই আইনজীবী নেতা। তিনি আহ্বান জানালেন, দ্রুততম সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ও হাইকোর্ট বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক বিচারপতি নিয়োগের।