Image description

মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালার একটি সালিশ বৈঠকের ভাইরাল ভিডিও এবং জুলাই আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। এই বিরোধের মূল কারণ এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ফেসবুক পোস্ট। তবে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনও বিরোধ নেই। কিন্তু তাদের এই বিরোধে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঢুকলো কীভাবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

প্রায় এক মাস আগের একটি স্থানীয় সালিশ বৈঠকে বিএনপির এক কর্মীর সঙ্গে এমপি হানজালার উত্তেজিত ও অশোভন আচরণের একটি খণ্ডিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এ নিয়ে প্রথমে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন রাশেদ খাঁন। এতে তিনি লেখেন, ‌‘এমপি হানজালাকে চিড়িয়াখানায় রাখা হোক, যাতে চিড়িয়াখানার কাউন্টার থেকে সবাই এই অদ্ভুত প্রাণীটাকে টিকিট কেটে দেখতে পারে। আজকে একজন বিএনপি নেতার সঙ্গে তার যে আচরণ দেখলাম, সত্যিই লজ্জা লাগছে, এসব ম্যানারলেস লোকজন কীভাবে এমপি হলো? এর আগে বিএনপিকে নিয়ে মন্তব্য করেছিল, “আমি হানজালা খোঁচাখুঁচি করলে বিএনপি এই দেশে থাকতে পারবে না।” আওয়ামী আমলে এদের এসব গর্জন তো দেখিনি। এরা তখন কোথায় ছিল? আজকাল এসব লোকদের এত বেশি ঔদ্ধত্য যে, সরকারি দলের লোকজনকে এরা আওয়ামী জামানার বিরোধীদলের মতো ট্রিট করে। হানজালাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ওরাই ক্ষমতায় আর বিএনপি বিরোধীদলে। বিএনপির দুর্ভাগ্য যে, এদের হজম করা লাগছে। রাজনৈতিক শূন্যতা ও সংকট না থাকলে আমি নিশ্চিত ওই বিএনপি নেতা এমপি নামক অদ্ভুত প্রাণীটাকে কানের নিচে দুই-পাঁচটা লাগিয়ে দিতো।’

এর জবাবে রাশেদ খাঁনকে কটাক্ষ করে পাল্টা পোস্ট দিয়ে সংসদ সদস্য হানজালা লিখেছেন, ‘রাশেদ খাঁন আমাকে চিড়িয়াখানায় দেখতে নিতে চায়। আমি তো যাবই, তবে থাকব বাঘের সঙ্গে—বাঘ অন্তত নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত না। আর রাশেদ খাঁনকে রেখে আসবো ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের এক গরুর পাশে। দেখি দুজন মিলে কতক্ষণ গল্প করতে পারে। চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষকে শুধু একটা অনুরোধ—গরুটা যেন পরে নাম পরিবর্তনের আবেদন না করে।’

পাল্টা জবাবে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের আগে এমপি হানজালা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন এবং আন্দোলনে ছিলেন না বলে অভিযোগ তোলেন রাশেদ খাঁন। এ নিয়ে আবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা হানজালা এখন বাঘের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় থাকতে চায়। হ্যাঁ, গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা ফ্যাসিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলে এসেছিল, আমরা কিন্তু আন্দোলনে নাই। তারা আবার নাকি এখন বাঘের সঙ্গে থাকতে চায়। বিশাল বিপ্লবী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। অথচ এই বিপ্লবীর হুংকার তো ৫ আগস্টের আগে কখনও শুনি নাই। তখন বিড়াল হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সোফায় গিয়ে বসে থাকতো। এখন বেশি বেশি মেকি হুংকার দিলে ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে বিচরণের অপরাধে প্রকৃত বাঘ কিন্তু এদের কলিজাও ছিঁড়ে খেতে দ্বিধা করবে না। আমরা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে উড়ে আসা বসন্তের কোকিল নয়। দুই দিনের বৈরাগী এসব হানজালারা যেসময় ফ্যাসিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় হাজিরা দিতো, আমরা সেসময় কোর্টে হাজিরা দিতাম। এরা যেসময় হাসিনার জিকির করতো, আমরা সেসময় বলেছি, এটা কি তার বাপের রাষ্ট্র? এরপর শেখ হাসিনাকে কটূক্তির দায়ে জেল খেটেছি। অথচ এরা এখন আইছে, বিএনপির কর্মীকে খেয়ে ফেলতে। এসব মানুষ খেকো হানজালারা হায়েনা হয়ে উঠতে চাইলে, থামানোর ওষুধও আমরা জানি।’

যা বলছেন দুজনে

তাদের মধ্যে এই বিরোধ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ সমালোচনাও করছেন।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালা বলেছেন, রাশেদ খাঁনের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। অহেতুক বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন। ওই সালিশের পুরো ভিডিও আমি ফেসবুকে পোস্ট করেছি। খণ্ডিত ভিডিও ছড়িয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এরই মধ্যে রাশেদ খাঁন আমাকে নিয়ে পোস্ট করলেন। তাতে ব্যক্তিগত আক্রমণও করলেন। এগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাশেদ খাঁন বাংলা বলেন, ‘এমপি হানজালার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনও বিরোধ নেই। তার সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ আছে। সম্প্রতি তিনি বিএনপিকে নিয়ে অশোভন মন্তব্য করেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন তার সঙ্গে খোঁচাখুঁচি করলে বিএনপি বেশি দিন টিকতে পারবে না। আরেক জায়গায় সালিশ বৈঠকে তিনি বিএনপির এক নেতাকে খেয়ে ফেলার হুমকি দেন। তিনি একটি ধর্মীয় দলের নেতা। তার মতো মানুষের কাছ থেকে এমন উগ্র আচরণ মানুষ প্রত্যাশা করে না। তিনি প্রতিপক্ষকে খেয়ে ফেলতে চান, তাই তাকে পশুর সঙ্গে তুলনা করেছি এবং চিড়িয়াখানায় আটকে রাখতে বলেছি। 
কারণ বিএনপির মতো মধ্যমপন্থি দলের নেতাদের মুখ থেকেও এমন বাজে কথা আসে না। আর আমার কথা পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কী প্রতিক্রিয়া দেখান সেটি তার ব্যাপার।’

হানজালাকে নিয়ে রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা

হানজালাকে নিয়ে একটি টেলিভিশন টকশোতে বিএনপির সংসদ প্রার্থী রাশেদ খাঁন কর্তৃক প্রদত্ত অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ। রবিবার এক বিবৃতিতে মহাসচিব বলেছেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া রাশেদ খাঁন শনিবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে সংসদ সদস্য হানজালার নামের সঙ্গে ‘হারামজাদার’ মতো অত্যন্ত আপত্তিকর, অশালীন ও নিন্দনীয় শব্দ উচ্চারণ করেছেন। আমরা এই জঘন্য, কুরুচিপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ এবং গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছি।