কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতির মাঠে ফিরতে চায় জামিনে থাকা পাঁচ নেতার কাঁধে ভর করে। এরই মধ্যে তাদের নেতৃত্বে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরুর আভাসও দেখা যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এমন তথ্য। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর এই চেষ্টা যাতে বেগবান হতে না পারে, সেজন্য সীমান্ত পার হয়ে আসা নেতাকর্মীদের ওপরও বিশেষ নজরদারি চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পুলিশ সদর দপ্তরের গোপন প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবসকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছিল। জামিনে মুক্ত থাকা কয়েকজন শীর্ষ নেতার নির্দেশনায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদারের পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরে আসা পলাতক নেতাকর্মীদের মাধ্যমেও সাংগঠনিক যোগাযোগ সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
গত ৭ জুন ‘ছয় দফা দিবস’ এবং ১১ জুন শেখ হাসিনার ‘কারামুক্তি দিবস’কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য, নির্দেশনা ও প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মীদের ফের সক্রিয় করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে।
সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফেরা
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অংশ এবং একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে অবস্থানরত পলাতক নেতাদের কেউ কেউ সীমান্ত দিয়ে দেশে এসে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে বলে অনেকের ধারণা রয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা এবং ক্রমাগত পুশইন চেষ্টার বিষয়টি প্রচার হওয়ায় পলাতক নেতাকর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন।
নিজেদের এলাকায় না থেকে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। এ কারণে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পাঁচ নেতার কর্মকাণ্ডে নজরদারি
পুলিশ সদর দপ্তরের সেই প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে জামিনে মুক্ত থাকা কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের নেতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মেজর জেনারেল (অব.) সালাহ উদ্দিন মিয়াজী, ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বলা হয়েছে, এসব নেতার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, এফ এম রহমত উল্লাহ এবং তোফায়েল আহমেদের জানাজা ঘিরেও বেশ সমাগম দেখা গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগ তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হয়।
এর বাইরে ‘দায়মুক্তি’ শিরোনামে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পর্বভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় করার জন্য তাদের উজ্জীবিত করছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অপতথ্য ছড়ানো সংক্রান্ত সাইবার প্যাট্রলিং ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ বিটিআরসির মাধ্যমে অপতথ্য দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে গোপনীয় প্রতিবেদনে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনেকেই সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছেন। দেশের আরও অনেক এলাকায় একই ধরনের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৬৭৮টি কর্মসূচির তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, বিক্ষোভ, লিফলেট বিতরণ, পোস্টারিং ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা, মিছিল, পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ বা অনলাইন প্রচারণার তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, সামনের দিনগুলোয় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের তৎপরতা, সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকারী পলাতক নেতাকর্মী এবং জামিনে থাকা শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি জোরদার করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
৬ জেলায় সেনা মোতায়েন
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে তিন মহানগর এলাকা ও তিন জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সোমবার থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে। এলাকাগুলো হলো— ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলা।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশের সব ইউনিটে। তারা এপিবিএন, র্যাব সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবেন। বিজিবির সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। পোশাকে এবং সাদা পোশাকে আমাদের ফোর্স দায়িত্ব পালন করবে।
যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় আমরা দেখেছি, তারা মিছিল-মিটিং করার মতো কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, দু-এক জায়গায় দেখেছি। তাতে আমাদের মনে হয়েছে, তারা হয়তো একটি অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলেও করতে পারে। এ বিবেচনায় আমরা আমাদের সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি, যা সবসময় থাকে।
পুলিশ কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না— এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘গত ১৫ জুন সারা দেশ থেকে সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর মাঠে ছিল, ইনটেরিম গভর্নমেন্টের সময় থেকে। আমরা নির্বাচিত সরকাের আসার পর যত দ্রুত সম্ভব তাদের মাঠ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা কয়েকটা জায়গায় ডেপ্লয় করতে যাচ্ছি, সেটার সঙ্গে ওই পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। এটা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার।’