চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরও করেছে।
এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ থামলেও সংকটের মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি, আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিক বৈঠক বাতিল হলেও ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে কঠিন দরকষাকষি এখনো বাকি রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য দূর করা না গেলে পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে যেতে পারে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আজ সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। বৈঠকে সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে বৈঠকটি বাতিল করা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার পর ওই বৈঠকের আর প্রয়োজন নেই।
প্রকাশিত ১৪ দফার ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পর অঞ্চল থেকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতিও কমাবে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতে প্রণালিটির প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।
তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা রয়ে গেছে পারমাণবিক ইস্যুতে। সমঝোতা স্মারকে ইরান আবারো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু দেশটির কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কী হবে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চায় এ মজুদ ধ্বংস করা হোক অথবা দেশটির বাইরে সরিয়ে নেয়া হোক। ইরান তা মানতে নারাজ। তেহরানের অবস্থান হলো আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে দেশে বসেই ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে।
আরেকটি বড় মতপার্থক্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে। ওয়াশিংটনের একটি অংশ এখনো ইরানের জন্য ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ নীতি চায়। কিন্তু ইরান এটিকে নিজেদের বৈধ অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে এ বিষয়ে সমঝোতা না হলে পুরো আলোচনা আটকে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রশ্নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমঝোতা স্মারকের ৬ ও ৭ নম্বর ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, আইএইএ ও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা হবে। তবে ঠিক কোন সময়সূচিতে এসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই।
স্মারকের ১০ ও ১১ নম্বর ধারায় যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে ইরানি তেল রফতানির ওপর ছাড় দেয়ার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের ভেতরেই এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকেরা বলছেন, চূড়ান্ত সমঝোতার আগেই তেহরানকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
তবে সমালোচনাকারীদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যারা চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করেন এবং মনে করেন তিনি ইরানের প্রতি যথেষ্ট কঠোর নন, তারা ব্যাড পিপল অথবা স্টুপিড। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘সমালোচকদের কথার বিপরীতে শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তেলের দাম কমে গেছে। এসব সমালোচক হয় হিংসুটে, খারাপ লোক, অথবা বোকা।’
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধের সময় কার্যত এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চায় এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে উন্মুক্ত ও টোলমুক্ত থাকুক। অন্যদিকে ইরান প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় নিজেদের বিশেষ ভূমিকা ধরে রাখতে আগ্রহী।
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে ইসরায়েলের অবস্থানও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ইসরায়েল এ মার্কিন-ইরান চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। অন্যদিকে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি না হলে এ চুক্তি টিকবে না। ফলে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে গেলে আলোচনার পরিবেশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাসও বড় বাধা। ইরানের নেতারা মনে করেন, অতীতের মতো যুক্তরাষ্ট্র আবারো কোনো চুক্তি থেকে সরে যেতে পারে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, তেহরান হয়তো সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে আলোচনা ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অতীতেও তারা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
সমঝোতা স্মারকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি যৌথ নির্বাহী ব্যবস্থা গঠন করা হবে এবং ভবিষ্যৎ চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের চেষ্টা করা হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা তুলনামূলক সহজ হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালির প্রশাসন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছা অনেক বেশি কঠিন। ফলে আজকের বৈঠক শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট পুরোপুরি সমাধানের নিশ্চয়তা এখনো অনেক দূরের পথ বলে মনে করছেন তারা। অনেকে বলছেন, ১৪ দফায় বেশির ভাগ সুবিধাই দেয়া হয়েছে তেহরানকে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালান আইয়ারের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমরা অন্তত রক্তক্ষরণ থামাতে পেরেছি এবং ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করতে সক্ষম হয়েছি। সামরিক অভিযান যে কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছিল না, সেটি অবশেষে উভয় পক্ষ উপলব্ধি করেছে—এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।’ চুক্তির বিষয়বস্তু মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সমঝোতার শর্তগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয় আলোচনায় ইরানই তুলনামূলক বেশি সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।’