Image description
১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে দুই পক্ষ। ► ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি-এটি সহজ ছিল না : ট্রাম্প ► আনুষ্ঠানিক মর্যাদা পেয়েছে : পেজেশকিয়ান।

যুদ্ধ বন্ধের জন্য স্থায়ী চুক্তিতে যেতে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৪ দফার এ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। অন্যদিকে তেহরানে ইলেকট্রনিকভাবে সই করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। ফলে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থার নেতারা।

গতকাল প্যারিসে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জোট জি৭-এর শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভার্সাই প্রাসাদে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিতে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি স্বাক্ষরের কিছুক্ষণ আগে হাতে কলম নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে বসে থাকা নেতাদের বলেন, ‘এটা সহজ ছিল না, এটুকু আমি বলতে পারি।’ এরপর তিনি কাগজে স্বাক্ষর করে সেটি অতিথিদের সামনে তুলে ধরেন।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্পের পাশে বসে আছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অন্য অতিথিরা, যাঁরা হাততালি দিচ্ছিলেন। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এটা সই হয়েছে। আমি ভার্সাইতে মাত্রই এটাতে সই করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাছে যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে ইরানের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা অন্যায় হবে না। যদি সৌদি আরব, কাতার ও অন্য দেশগুলোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে তুলনামূলক ভারসাম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের কাছেও কিছু থাকা ঠিক আছে বলে আমি মনে করি।’ ট্রাম্প বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রই মূল সমস্যা নয়। ক্ষেপণাস্ত্র কোনো ছোট জায়গায় আঘাত করতে পারে, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের মতো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করতে পারে না। অন্যদিকে তেহরানে ইরানের পক্ষে সমঝোতা চুক্তিতে সই করেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনাকে বলেন, প্রেসিডেন্টের সই করার মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন এ চুক্তির বাস্তবায়ন যাচাই করার সময় এসেছে। সমঝোতা স্মারকটি ইলেকট্রনিকভাবে সই হয়েছে। এটা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিকতার পরিকল্পনা নেই ইরানের। তিনি আরও বলেন, যখন কোনো নথিতে দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সই করেন, তখন সেটি লঙ্ঘনের মূল্য স্বাভাবিকভাবে অনেক চড়া হয়। অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা চেয়েছিলাম, বিষয়টি এভাবেই হোক। ১৪ দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত। সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আলোচনার সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হবে বলে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে এতে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে। স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আজ (শুক্রবার) থেকে সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় বসবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আয়োজনকারী দেশ সুইজারল্যান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের সঙ্গে শুক্রবার বুর্গেনস্টকে সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হবে। এ বৈঠকের সময়সূচি ও বিস্তারিত বিষয়ে বর্তমানে আর কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। তিনি বলেন, স্মারক সমঝোতা হওয়াটা ভালো হয়েছে। এখন কারিগরি কাজ শুরু হবে। গ্রোসি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় অংশ নিতে আমি আগ্রহী। এখন আমাদের মার্কিন ও ইরানি সহকর্মীদের সঙ্গে বসে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নির্ধারণ করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। টানা ৪০ দিন পাল্টাপাল্টি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রতিরোধে অর্ধশতাধিক মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ধ্বংস হয়। পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। পরে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধ বিরতিতে যায় দুই দেশ।