১০টি কারণে রাজধানী ঢাকায় দুর্বিষহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সড়কে নির্দিষ্ট লেন না থাকা, অটোরিকশার আধিপত্য ও উল্টোপথে চলাচল, রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে থামিয়ে যাত্রী ওঠানো ও নামানো, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, চালকদের আইন মানতে অনীহা, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য, যাত্রীদের ইচ্ছেমতো জায়গায় নামানো, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, সড়ক দখল করে ব্যবসা, শাখা রাস্তায় ঢুকতে না পারা যানজটের অন্যতম কারণ। এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে যানজট নিরসন সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার প্রধান সড়ক ও সিগন্যালে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে যানজটের যে কারণগুলো পাওয়া গেছে তা হলো-
রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে থামিয়ে যাত্রী ওঠানো ও নামানো : রাস্তার মাঝখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো নামানো রাজধানীর গণপরিবহনগুলোর নিত্যদিনের ঘটনা। সিটিং সার্ভিস, লোকাল বাসগুলো নির্দিষ্ট বাস স্টপেজে যাত্রী না নামিয়ে যাত্রীদের ইচ্ছেমতো জায়গায় নামাচ্ছেন। গত সোমবার বেলা ১১টার চিত্র। রাজধানীর এয়ারপোর্টে ভিআইপি পরিবহন, ঢাকা মেট্রো-ব ১১৮৫৮০ নম্বরের বাসকে প্রায় ১০ মিনিট আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী তুলতে দেখা যায়। এ সময় বাসটির পেছনে গণপরিবহনের দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পাশাপাশি প্রজাপতি পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৫২০১১, ১১৯৩০৩ গাড়ি আড়াআড়ি করে রাখায় বাস বের হতে পারছিল না। এতে বিশৃঙ্খলা এবং জটলার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও দুপুরে খিলক্ষেত, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা এলাকায় বিভিন্ন পরিবহনের বাস তুরাগ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১৯০৭১, ১৪১৭২৯, ১৫১৭১৪; রাইদা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৯০০৫৯, ১৫১৫২২, ১১৭৩৮৮, ১১৮৬১৫, ১৩২৩৮৭; ভিক্টর পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৩০২৪৫, ১৩০০৫৬, ১২০৭০৩, ১৫১৫৬৭; অছিম পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১২০৩০৬, ১১৮৫১১, ১৩০৬১৭; গোল্ডেন সিটি পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৩০০৫৩; রাজধানী পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১২৪৬৭৩; অনাবিল পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১২৫৮৭৭, ১৩১৫০২; আসমানী পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১১৮৭৬৮, ১৫৪৪৩৬, ১৫৩০৬৬; মনজিল পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব ১৫৩৪৩৮ নম্বরের বাসকে রাস্তা ব্লক করে যাত্রী ওঠাতে এবং নামাতে দেখা গেছে। এই নম্বরের বাস ছাড়াও বলাকা সার্ভিস, মধুমতী পরিবহন, বসুমতি পরিবহন, বনশ্রী পরিবহনের অনেক বাস প্রতিদিনই একই কাজ করে আসছে। রাত হয়ে যাওয়ায় এসব বাসের নম্বর নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সড়কে নির্দিষ্ট লেন না থাকা : ব্যস্ততম এই শহরের প্রধান সড়কগুলোতে এখনো যানবাহন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো লেন নেই। গত সোমবার রাজধানীর নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা এলাকায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল রাস্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কোনো লেন না থাকায় চালকরা হঠাৎ করে লেন পরিবর্তন করছেন এবং একটু ফাঁকা পাওয়া মাত্রই সেখান দিয়ে মোটরসাইকেল ঢুকিয়ে দিচ্ছেন চালকরা। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
অটোরিকশার আধিপত্য ও উল্টোপথে চলাচল : রাজধানীর বিভিন্ন এভিনিউ সড়ক ও লিংক রোডের মোড়ে, মেট্রোস্টেশনের নিচে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর আধিপত্য বেড়েই চলেছে। দেখা গেছে মতিঝিল, কারওয়ান বাজার মেট্রোস্টেশনের নিচে সারিসারি অটোরিকশা সড়ক আটকিয়ে যাত্রী তুলছে।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন : অপরিকল্পিত উন্নয়ন রাজধানীর যানজটের অন্যতম প্রধান একটি কারণ। রাজধানীতে প্রায়ই দেখা যায় রাস্তার কাজের জন্য এক সাইড বন্ধ করে রাস্তা মেরামতের কাজ করছে। এতে অপরদিকের রাস্তায় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় এবং দুই দিক দিয়ে যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হয় যানজটের।
চালকদের আইন মানতে অনীহা : সময় বাঁচাতে যানবাহনের চালকরা অনেক সময়ই আইন মানতে চান না। রাজধানীর কয়েকটি রাস্তায় এআই ক্যামেরা লাগানোয় পরিস্থিতি কিছুটা সুশৃঙ্খল হয়। তবে যেসব এলাকায় এআই ক্যামেরা নেই, সেসব এলাকায় যানবাহনের চালকরা আইন মানতে চান না। ঢাকার নতুনবাজার রোডে একটি কালো মাইক্রোবাস সামনে যাওয়ার কথা থাকলেও গাড়িটি নিয়ে চালক পেছন দিকে চালাচ্ছিলেন।
ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য : ঢাকার রাস্তায় বের হলেই গণপরিবহনের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাই বেশি। এই ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ সড়কে যানজট সৃষ্টি করছে।
যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং : ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় দূরপাল্লার বাস, প্রাইভেটকার, মিনি ট্রাক, লেগুনা, নষ্ট বাস পার্ক করে রাখেন। এত রাস্তা সরু হয়ে আসে এবং যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। উত্তরা-আবদুল্লাপুরে রাতের বেলা দূরপাল্লার বাস পার্কিং করে রাখার চিত্র প্রতিদিনের।
সড়ক দখল করে ব্যবসা : খিলক্ষেতে সন্ধ্যার পর থেকেই ভ্যান নিয়ে সড়ক দখল করে অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন অনেকে। এতে রাস্তা সরু হচ্ছে এবং যানজট সৃষ্টি করছে।
শাখা রাস্তায় ঢুকতে না পারা : শাখা রাস্তায় ঢুকতে না পারা যানজট সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ। এতে অনেক যানবাহনকে অনেক সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। নতুনবাজার থেকে গুলশান এলাকায় ঢোকার রাস্তায় এমনই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, সড়কের বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) অদক্ষতা ও বিজ্ঞানহীন রুট পারমিট ব্যবস্থা। আর একই কোম্পানির নামে ভিন্ন ভিন্ন মালিকের বাস সড়কে চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার মূল কারণ। এসব কারণই রাস্তায় যানজট ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, যত্রতত্র বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা রোধে বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ কোনো বাসই নিয়ম মানতে চায় না। রুট পারমিট নেই এমন অনেক বাসও ঢাকায় চলাচল করছে। এগুলো যখন শুধু একটি সিস্টেমের মধ্যে চলে আসবে, তখন শৃঙ্খলা সম্ভব হবে।