যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে এশিয়ার দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব এত দ্রুত দূর হবে না। চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত, এমনকি তার পরও এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
গত সাড়ে তিন মাসে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়ে। অনেক দেশের মুদ্রার মান কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং সরবরাহ-ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর এশিয়ার ব্যাপক নির্ভরতা। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পৌঁছে থাকে।
গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আগামী শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তি কার্যকর হলে দীর্ঘদিন আটকে থাকা তেল, গ্যাস ও জ্বালানিপণ্যবাহী শত শত ট্যাংকার আবার গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করতে পারবে। এতে এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে অর্থনীতিবিদ ও শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভাইস চেয়ারম্যান জোশুয়া এনগু বলেন, প্রণালি খুলে গেলে জ্বালানি সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। তবে তিন মাসের বেশি সময় ধরে এ পথ বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে এবং সরবরাহ-ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য চুক্তির খবরে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি এই উদ্যোগকে সংকট সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলো কৌশলগত মজুত ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। তবুও তেলের উচ্চমূল্য তাদের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সার সরবরাহ ও শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ
বিশ্বের ইউরিয়া সারের বড় অংশ সরবরাহ করে ইরান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। চলমান সংকটের কারণে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে ফসল বোনার মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট পার্ক বলেন, স্বল্প সময়ের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও এটি যদি কৃষি মৌসুমের গভীরে প্রবেশ করে, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ন্যাপথা সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্লাস্টিক ও খাদ্যপণ্যের মোড়ক তৈরিতে ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল উপাদানের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি সংস্থার উপদেষ্টা হারুহিকো সাকাইনো মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চালান পুনরায় শুরু হলেও ন্যাপথা সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।