পুশইন নিয়ে ঢাকা-দিল্লির অস্বস্তির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে হেনস্তার ঘটনা ঘটল দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। অথচ অতিথি হিসাবে ভারতে প্রবেশের জন্য রাষ্ট্রীয়, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সব ধাপ সম্পন্ন হয়েছিল। তারপরও বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়। এ ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। সোমবারই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। এতে জনমনেও একধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন ঘটনায় ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আরেক দফা অস্বস্তির মধ্যে পড়ল। তাদের মতে, ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অসৌজন্যমূলক আচরণের অংশ এবং শিষ্টাচারবহির্ভূত। এমনটা কেন ঘটল, দিল্লিকে তার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ারও দাবি তুলছেন কেউ কেউ।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ডা. জাহেদ উর রহমানের। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ১৫ ও ১৬ জুন আইওআরএ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কমিটির ২৮তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের অংশগ্রহণের বিষয়টি ১২ জুন দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে অবহিত করেছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার ভিসাও ইস্যু করে। কিন্তু তারপরও বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখে। এ সময় তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
ঘটনাটিকে আত্মসম্মানের প্রশ্ন হিসাবে বিবেচনা করে নিজের পাসপোর্ট ফেরত চান ডা. জাহেদ উর রহমান। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কয়েকটি গণমাধ্যম বলছে, পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে একাধিকবার ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানালেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
ভারতীয় সংবাদ পোর্টাল সিএনএন-নিউজ ১৮ জানায়, নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একটি নজরদারি তালিকায় (ওয়াচলিস্ট) নাম থাকার কারণে দিল্লির বিমানবন্দরে ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ডা. জাহেদ উর রহমানকে কিছুক্ষণ আটকে রাখে। রুটিন তল্লাশির সময় তার নামটি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের নজরে আসে এবং পরে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তাকে থামানো হয়।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা; এটি দুঃখজনকও বটে। এ সময় তিনি এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান।
একই ইস্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে যা হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। ঘটনার বিস্তারিত খবর নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট উইং। এরপর সরকার ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার বঢ়েকে সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তলব করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগ) ইশরাত জাহান ঢাকার প্রতিবাদপত্র তার হাতে তুলে দেন বলে জানা গেছে।
সরকারি উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার অন্য দেশে অতিথি হিসাবে ভ্রমণ প্রক্রিয়ার ধাপগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, যখন সরকারি উচ্চপর্যায়ের কেউ অন্য কোনো দেশে যেতে চান, তখন সে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি নোট দেওয়া হয়। যিনি যাবেন, তার স্ট্যাটাস, কী আয়োজনে সেখানে যাচ্ছেন, আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে দলের নেতৃত্ব দেবেন-সব জানানো হয়। তার পাসপোর্টসহ এসব নোট দিয়েই ভিসা নেওয়া হয়। ভিসা দেওয়ার পর আয়োজক দেশ তাদের সরকারকে অবগত করে যে, এমন একজন ভিআইপিকে ভিসা দেওয়া হয়েছে, যিনি এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করবেন। অতিথি দেশের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে ভ্রমণকারী দেশকে তার আগমনের তারিখ, ফ্লাইটসহ সবকিছুই জানানো হয়। তখন অতিথিকে ভিআইপি প্রটোকলে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
ধরে নেব, ডা. জাহেদ উর রহমানের সফরের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়দিক থেকে সবকিছুই সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, এতসব প্রক্রিয়ার পরও দিল্লি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে ডা. জাহেদকে এভাবে বসিয়ে রাখা, তাকে নানা প্রশ্ন করা হয়েছে। এই ঘটনা সেখানে অনেকে দেখেছেন। এতে তাকে অসম্মান করা হয়েছে। বিষয়টি অসৌজন্যমূলক। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কী পর্যায়ে আছে এবং তারা আসলে কেমন সম্পর্ক চায়। বাংলাদেশকে কীভাবে দেখছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এতে। এ ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবাদ জানিয়েছে। এটি সঠিক পন্থা। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার সময়ে আমরা অনুমান করতে পারি ডা. জাহেদ বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। উচ্চতর মহলের সিদ্ধান্তমতে তিনি ঢাকা ফিরে এসেছেন।
জানা যায়, ভারতে আইওআরএ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টার কাছে কোনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল না। তার সঙ্গে সার্কের স্টিকারযুক্ত সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট ছিল। তবে জাহেদ উর রহমানের সফরের বিষয়টি জানিয়ে এর আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র (নোট ভারবাল) পাঠিয়েছিল নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। রোববার বিকালে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে দিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা যায়।
রোববার রাতে ডা. জাহেদ উর রহমান দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেও তখন দিল্লি থেকে সরাসরি ঢাকায় ফেরার কোনো ফ্লাইট না থাকায় তিনি এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে কলম্বো যান। সফর বাতিল করে সোমবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে শ্রীলংকান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। এ সময় গণমাধ্যমের সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলেননি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি ভারতে যাবেন, কেন যাবেন, সে বিষয়ে সবকিছুই তাদের অবগত করা আছে বলেই ধরে নিচ্ছি। তারপরও ভারতের দিক থেকে এমন আচরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাখ্যা চেয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়েও ভারতকে আমরা বলতে পারি। ভারতের দিক থেকে যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সেটি স্বীকার করুক। আমরা সেটাই আশা করি।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, গুরুতর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ‘স্যাবোটাজ’ হয়েছে, অন্যায় হয়েছে। এটি একাধারে দুঃখজনক এবং উসকানিমূলক। এটাকে শুধু ভুল বোঝাবুঝি বলে পাশ কাটানো যাবে না। আমরা ভারতের কাছে এ বিষয়ে জবাবদিহি, ব্যাখ্যা চাই। কিন্তু ড্যামেজ তো একটু হয়েই গেছে।