Image description

ইরানের সাবেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করার প্রতিশোধ হিসেবে এবার খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে হত্যার ছক কষেছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক ব্যক্তি। 'দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট' এই খবর জানিয়েছে।

 

সম্প্রতি প্রেপ্তার হওয়া ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ বাকের সাদ দাউদ আল-সাদি ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে হত্যার 'অঙ্গীকার' করেছিল। শুধু তা-ই নয়, ফ্লোরিডায় ইভাঙ্কার বাড়ির একটি মানচিত্র বা নকশাও সে সংগ্রহ করেছিল বলে দাবি করেছে সূত্রগুলো।

 

ইরাকি নাগরিক আল-সাদি মূলত মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত আইআরজিসি'র শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানির হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। ছয় বছর আগে বাগদাদে ওই ড্রোন হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইরাকি দূতাবাসের সাবেক উপ-সামরিক কর্মকর্তা ইনতিফাদ কানবার 'দ্য পোস্ট'-কে বলেন, 'কাসেম নিহত হওয়ার পর আল-সাদি লোকজনকে বলে বেড়াত, 'ট্রাম্প যেভাবে আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছেন, সেভাবেই ট্রাম্পের বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে আমাদের ইভাঙ্কাকে খুন করতে হবে'।'

কানবার আরও বলেন, 'আমরা শুনেছি যে তার কাছে ফ্লোরিডায় ইভাঙ্কার বাড়ির একটি নকশা ছিল।' অন্য আরেকটি সূত্রও আল-সাদির এই হত্যার ছক নিশ্চিত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ব্যক্তি বেশ সরব ছিল। সে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ফ্লোরিডার ওই বিশেষ আবাসিক এলাকার একটি মানচিত্র পোস্ট করে, যেখানে ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জ্যারেড কুশনারের ২৪ মিলিয়ন ডলারের বাড়ি রয়েছে। মানচিত্রের পাশাপাশি সে আরবিতে একটি হুমকি দেয়, যার অর্থ: 'আমি আমেরিকানদের বলছি এই ছবিটার দিকে তাকাতে। জেনে রাখো, তোমাদের রাজপ্রাসাদ বা সিক্রেট সার্ভিস কেউই তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। আমরা এখন নজরদারি আর বিশ্লেষণের পর্যায়ে আছি। আমি তোমাদের আগেই বলেছি, আমাদের প্রতিশোধ নেওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার।'

আল-সাদি ইরাক ও ইরানের সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কের বেশ উপরের সারির একজন ব্যক্তি বলে পরিচিত। মার্কিন বিচার বিভাগের মতে, গত ১৫ মে তুরস্ক থেকে আটকের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মিলিয়ে মোট ১৮টি হামলা ও হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে থাকা উল্লেখযোগ্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—গত মার্চ মাসে আমস্টারডামের 'ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন'-এ বোমা হামলা, এপ্রিলে লন্ডনে দুই ইহুদিকে ছুরিকাঘাত এবং মার্চে টরন্টোতে মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের সামনে গুলি চালানোর ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্তকারীদের মতে, আল-সাদি বেশ কিছু হামলার 'পরিকল্পনা ও সমন্বয়' করেছে এবং বেলজিয়ামের একটি ইহুদি উপাসনালয়ে বোমা হামলা, রটারড্যামে একটি মন্দিরে আগুন লাগানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া কিছু ব্যর্থ হামলারও দায় স্বীকার করেছে।

৪৪ বছর বয়সী ইভাঙ্কা ট্রাম্প রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনারকে বিয়ের আগে ২০০৯ সালে অর্থোডক্স ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এই গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

জানা যায়, আল-সাদি একইসাথে 'কাতায়েব হিজবুল্লাহ' এবং ইরানের আইআরজিসি-র হয়ে কাজ করত।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউট'-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এলিজাবেথ সুরকোভ বলেন, 'প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, মোহাম্মদ বাকের কাসেম সোলেইমানির বেশ কাছের মানুষ এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর যেকোনো কর্মীর জন্য এটি অনেক বড় একটি ব্যাপার। সোলেইমানির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথেও সে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখে।' সুরকোভ ২০২৩ সালে বাগদাদে অপহৃত হয়ে 'কাতায়েব হিজবুল্লাহ'-র হাতে ৯০৩ দিন বন্দি ছিলেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান।

তবে আল-সাদি তাকে জিম্মি করা লোকদের মধ্যে ছিল কি না, তা সুরকোভ নিশ্চিত করতে পারেননি। কারণ, বন্দি অবস্থায় জিম্মিকারীরা সবসময় মুখোশ পরে থাকত।

সুরকোভ জানান, আল-সাদি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং কানি তাকে এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্পদ দিয়ে যেতেন।

এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আল-সাদির আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কানবারের মতে, আল-সাদি কাসেম সোলেইমানির অনেক কাছাকাছি ছিল এবং তাকে পিতৃস্থানীয় মনে করত। আল-সাদির নিজের বাবা, যিনি নিজেও ইরানের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন, ২০০৬ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর সে সোলেইমানিকে আরও আপন করে নেয়।

আল-সাদির জীবনের বড় একটা অংশ কাটে বাগদাদে, মূলত তার ইরাকি মায়ের কাছে। কিন্তু পরে সে আইআরজিসি-র অধীনে প্রশিক্ষণ নিতে তেহরানে যায় বলে জানান কানবার।

কানবার দাবি করেন, পরবর্তীতে আল-সাদি ধর্মীয় ভ্রমণের একটি ট্রাভেল এজেন্সি খোলে, যার আড়ালে মূলত বিশ্বের নানা দেশে একটি নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ার কাজ চালাত সে।

গত সপ্তাহে তুরস্কে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় আল-সাদির কাছে ইরাকি সরকারি বা 'সার্ভিস পাসপোর্ট' পাওয়া যায়। এই পাসপোর্ট মূলত সরকারি কর্মচারী এবং আমলাদের দেওয়া হয় এবং ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া এটি পাওয়া সম্ভব নয় বলে কানবার জানিয়েছেন।

এই পাসপোর্টের সুবিধা ব্যবহার করে সে সহজেই ভ্রমণ করতে পারত, ইরাকি বিমানবন্দরে সাধারণ তল্লাশি এড়াতে পারত এবং ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পেত।

যদিও বিশ্বের অন্যান্য বিমানবন্দরে তাকে তল্লাশির ভেতর দিয়েই যেতে হতো, কানবারের মতে, এই পাসপোর্ট থাকার কারণে সে খুব সহজেই এমন সব দেশের ভিসা পেত যেখানে সে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ধরা পড়ার সময় আল-সাদি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়।

তবে আইআরজিসি'র সন্দেহভাজন এই সদস্য হিসেবে আল-সাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু বেশিই সক্রিয় ছিল। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে দেখা যায়, সে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার এবং কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া, কায়াকিং করার সময়কার সেলফি এবং একটি মিসাইলের পাশে দাঁড়িয়ে বুক বরাবর হাত রাখা ছবিও সে আপলোড করেছিল।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, আল-সাদির স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্টে এমন ছবিও পাওয়া গেছে যেখানে সে কাসেম সোলেইমানির সাথে কোনো একটি সামরিক ঘাঁটিতে বসে মানচিত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনা করছে।

ফেডারেল আদালতের নথি অনুযায়ী, সোলেইমানি নিহত হওয়ার সাত মাস পর, ২০২০ সালের আগস্টে আল-সাদি এক্স-এ একটি ছবি পোস্ট করে। ছবিতে এক সন্দেহভাজন কর্মীর হাতে একে-৪৭ রাইফেলসহ সোলেইমানি এবং মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত অন্য এক সামরিক নেতার ছবি দেখা যায়। ছবিটির ক্যাপশনে সে লিখেছিল: 'আমেরিকান শত্রুরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে যাচ্ছি এবং আমার সব ফোন বন্ধ করে দিচ্ছি… জয় অথবা শাহাদাত।'

তবে, ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্ম থেকে তার এই বিদায় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালে সে তার এক্স অ্যাকাউন্টে আরেকটি পোস্ট দিয়ে এটিকে তার 'শেষ টুইট' বলে উল্লেখ করে। ওই পোস্টে সে সোলেইমানি এবং মার্কিন হামলায় নিহত অন্য ইরানি সামরিক নেতাদের 'শহীদ' বলে আখ্যায়িত করে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, সেই পোস্টে সে লেখে: 'আমি তোমাদের সাথে প্রচণ্ড দুর্বলতা এবং গভীর শকের মধ্য দিয়ে কথা বলছি, যা আমি জীবনে মাত্র একবার অনুভব করেছি—কাসেম সোলেইমানির শাহাদাতের দিন।'

আল-সাদি তার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুদের স্ন্যাপচ্যাট মেসেজ এবং সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে হুমকি দিত। দ্য পোস্ট-এর দেখা মেসেজ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই সে সাইলেন্সার লাগানো একটি পিস্তলের ছবি পাঠাত।

এই সন্দেহভাজন কর্মীর সাথে লেবাননের প্যারামিলিটারি ফোর্স হিজবুল্লাহরও সংযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বর্তমানে সে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের সলিটারি কনফাইনমেন্ট বা নিঃসঙ্গ সেলে বন্দি রয়েছে। সেখানে সিইও-দের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত লুইগি ম্যানজিওন এবং আটক হওয়া ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মতো হাই-প্রোফাইল বন্দিরাও রয়েছে।