Image description
রয়টার্সের বিশ্লেষণ

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে একের পর এক কৌশলগত সাফল্যের দাবি করলেও, তিন মাস পর এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন বড় প্রশ্ন তিনি কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধেই হেরে যাচ্ছেন?

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর ব্যাপক সামরিক চাপ প্রয়োগের পরো দেশটির পারস্য উপসাগরীয় কৌশলগত প্রভাব, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি থামানো যায়নি। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ বিজয়ের দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, নৌবাহিনীর বড় অংশ এবং সামরিক নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তেহরান দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয় ইরান। পাশাপাশি ইসরাইল ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশেও হামলা চালানো হয়।

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহের মধ্যেই অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হবে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহ পার হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান মেলেনি। বরং কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও নতুন করে হামলার হুমকি পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, যে যুদ্ধকে ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি সাফল্য হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন, সেটি এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতায় রূপ নিচ্ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, আঞ্চলিক হুমকি কমানো এবং দেশটির শাসকদের দুর্বল করা। তবে এখন পর্যন্ত এসব লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির শাসকগোষ্ঠী এটিকে নিজেদের টিকে থাকার সাফল্য হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে তারা বুঝতে পেরেছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের প্রভাব এখনও কার্যকর।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পরো ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে রাজি নয়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা আরও বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা যায়।

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনঅসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও আগের মতো একক সমর্থন আর দেখা যাচ্ছে না।

তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা বলছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত হানা নিজেই একটি কৌশলগত সাফল্য। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা আলেকজান্ডার গ্রে দাবি করেন, এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো আবারো যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি এসেছে এবং চীন থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে।

এদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও যুদ্ধে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সীমাবদ্ধতা এবং ইরানের অসম যুদ্ধকৌশল থেকে শিক্ষা নিচ্ছে বলেও মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে, সামরিক শক্তির প্রদর্শন সত্ত্বেও ট্রাম্প এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে যুদ্ধের স্পষ্ট সমাপ্তি কিংবা রাজনৈতিক বিজয়ের পথ এখনও অনিশ্চিত।

সূত্র: রয়টার্স