একের পর এক অভিযান, মামলা, গ্রেপ্তার- কোনো কিছুতে থামানো যাচ্ছে না অপরাধীদের। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে- একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার জড়িয়ে পড়ছে পুরনো অপরাধে। আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের হয়ে অপরাধীরা আবারো একই অপরাধে জড়াচ্ছে। ছিনতাই, মাদক ও চুরি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের বিরুদ্ধেই আগে একাধিক মামলা রয়েছে। জামিনে বের হওয়া অপরাধীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হুমকি এবং অস্ত্রের মহড়া দেয়ার মতো অভিযোগ পাওয়া যায়। জামিনে বের হওয়ার পর অধিকাংশ অপরাধী তাদের আগের চক্রে ফিরে যায়। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই জামিন পেয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জামিনে বের হয়ে অপরাধী চক্রের পুনরায় সক্রিয় হওয়া দেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।
সম্প্রতি অপরাধীদের বিরুদ্ধে মহানগরীতে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অনলাইন জুয়া চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সকল কর্ম-পরিকল্পনা সাজিয়ে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মাদক অধিদপ্তর ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে সকল মেট্রোপলিটন এলাকায় চলছে বিশেষ এ অভিযান। মাদক ব্যবসার মূল রুটগুলোতে রয়েছে কড়া নজরদারি। সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায় দেশ জুড়ে মাদক, অবৈধ জুয়া ও নানাবিধ অপরাধের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিবি’র সাদা পোশাকের সদস্য, সাইবার মনিটরিং টিম এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
অনলাইন জুয়া, প্রতারণা ও সংঘটিত অপরাধে প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। বাজার, টার্মিনাল, কাঁচাবাজার, ব্যবসাকেন্দ্র ও স্পর্শকাতর এলাকায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন, অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অভিযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিএমপি তাৎক্ষণিকভাবে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধ নির্মূলে দেশব্যাপী যে অভিযান চলছে ইতিমধ্যে সকল কর্ম-পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। সরকার মাদক ও অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং দেশ জুড়ে কঠোর সাঁড়াশি অভিযান চালানোর বার্তা দিয়েছে। সেটি পুলিশ সদর দপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করছেন। পুলিশ সদর দপ্তর মনে করে, মাদক নির্মূল করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, ঢাকা মহানগরী আমাদের সবার। এই শহরের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে গত ১লা মে থেকে ডিএমপি মহানগর জুড়ে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান আরও জোরদার করেছে। এ ছাড়া সক্রিয় মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদার, নাগরিকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বসিলা ও কাওরান বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব এলাকায় চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করছে। বাজার ও জনবহুল স্থানে দৃশ্যমান পুলিশিং বৃদ্ধি করা হয়েছে, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, গ্রেপ্তার এবং সাজা দেয়ার পাশাপাশি একজন অপরাধী যেন পুনরায় অপরাধে জড়াতে না পারে সেদিকটায় সতর্ক থাকা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। এই দুই জায়গাতে ঘাটতি রয়েছে। এজন্য নির্ভয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, অপরাধীরা যে অপরাধ করেছে সেই অনুযায়ী তার যথাযথ শাস্তি হচ্ছে না বা সেই মামলাটা আদালতে দুর্বল করে উপস্থাপন করা হলে এবং আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে আসে। নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে এসব অপরাধী জামিনে বেরিয়ে এলে তখন সে প্রকৃত সাজা ভোগ করার পরিবর্তে সে আরও অপরাধ পরিচালনায় শক্তিশালী হয়ে উঠে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত আছে তারা যথাযথ আইনের প্রয়োগ না করতে পারে তাহলে কোনো কিছুই কার্যকর হয় না। আইনের প্রয়োগটা কঠোর হতে হবে, আইনের প্রয়োগের জায়গাতে কাউকে সুযোগ, আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়াকে বন্ধ করতে হবে। এই ধরনের অপরাধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং অপরাধী কেন সৃষ্টি হয়, আইনের ব্যত্যয় বা যে বা যারা অপরাধী তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।