প্রায় দেড় বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘কঠিন সময়’ পেরিয়ে এখন ‘নবযাত্রা’ চায় ভারত। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনাও করেছে নয়াদিল্লি। সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে থাকা ৪০টির বেশি বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম (মেকানিজম) আবার চালু করতে উদ্যোগী হয়েছে দুই দেশ। স্থবির সম্পর্ক নতুন করে চালুর এ নবযাত্রায় আস্থা ও মর্যাদার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে ভারত। গত এক সপ্তাহে ভারতের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক, রাজনীতিক, বেসরকারি থিঙ্কট্যাংক ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের নেতারা বাংলাদেশি সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাক্ষাতে পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রায় সব ইস্যুতে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে যাত্রা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। অন্য দেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করতে স্পিকার সাধারণত যান না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে স্পিকারকেই পাঠানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আবার গড়তে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া রয়েছে। সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। সেখানে পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশের সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আর সবকিছুর মূলে থাকবে দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণ। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, অতীতে আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি।
বাংলাদেশে যখন যে সরকার থাকবে, আমরা কাজ করব। এটাই স্বাভাবিক। তবে একটি সরকার অন্য একটি সরকারের সঙ্গে দুই দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করে। ভারত থেকে বাংলাদেশে যে বিদ্যুৎ যায়, তা কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতা-কর্মীদের ঘরে যায় না, সব নাগরিকের কাছেই পৌঁছায়। নদীর পানির ক্ষেত্রেও তাই। অবশ্য অতীতে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনের জয়ের জন্য ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অংশ নেয়নি ভারত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নাটকীয় ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিঘিœত হয়েছে। এখন জোরালো সমর্থন নিয়ে একটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন দুই দেশের জনগণকে সস্পর্কের কেন্দ্রে রেখে তাদের জন্য লাভজনক সস্পর্ক গড়ার দিকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি সম্পর্কে প্রভাব রাখবে কি না- এমন প্রশ্নে বিক্রম মিশ্রি বলেন, কোনো ব্যক্তির ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না।
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও নয়াদিল্লিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর পঙ্কজ শরণ বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, তখন দুই দেশের সম্পর্ক বড় আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন জোরালো সমর্থন নিয়ে এবার ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সময় তিক্ততার পুনরাবৃত্তি চাইবে না ভারত। পঙ্কজ শরণ বলেন, নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের সিদ্ধান্তটি চমৎকার। নতুন হাইকমিশনার ভারতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, অভিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশের শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য বিষয় ভালো বোঝেন। তিনি সবেচেয়ে কঠিন সমস্যার সমাধান দিতে পারবেন। পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের জয়ের ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে আটকে থাকা বিষয়গুলো সমাধান হতে শুরু করবে বলে তিনি আশাবাদী। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত কবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, রাজনীতিবিদদের ভারত বা অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়া আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় নয়। এটা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রমী কিছু নয়।
অতীতেও এমন অনেক উদাহরণ আছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন। তাই এটি একটি সাধারণ বিষয়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তিনি জিয়াউর রহমানের সরকারের সমরয়েই ঢাকায় ফিরেছিলেন। বর্তমানে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল এবং আমাদের দেখতে হবে দুই সরকার কীভাবে এটি পরিচালনা করে। আশা করি, এমনভাবে সমাধান হবে, যাতে উভয় দেশের সন্তুষ্টি থাকে। বাংলাদেশে ভারতের আরেক সাবেক হাইকমিশনার ও বিজেপির রাজ্য সভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুই দেশের সরকার আস্থায় আসতে পারলে লাভবান হবে দুই দেশই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের ফলে এখন সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে। বাংলাদেশের তিস্তাসহ কয়েকটি বিষয় আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জন্য আটকে ছিল। কিন্তু এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে কাজ করা সহজ হবে। ভারতের শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক পঙ্কজ ট্যান্ডন বলেছেন, দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়ে কথা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই প্রথম আহ্বান এসেছে। এতে ভারতও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এখন দুই দেশেরই উচিত হবে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।