Image description

প্রাকৃতিকভাবেই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো একইসঙ্গে আশীর্বাদপ্রাপ্ত এবং অভিশাপগ্রস্ত, এমনটাই বলা হয়ে থাকে। কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলাফলে জ্বালানি-সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে পৃথিবীর অন্য যে কোনো স্থানের চেয়ে তেল-গ্যাস সর্বোচ্চ পাওয়া যায়। এ জন্য সমৃদ্ধ সম্পদের পাশাপাশি দুর্ভাবনা আর দুর্ভাগ্যও এই অঞ্চলগুলোর পিছু ছাড়েনি। চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের জ্বালানি সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

 

এ অঞ্চলের হাইড্রোকার্বন সম্পদের বিশালতা বিস্ময়কর। পারস্য উপসাগরের আশেপাশে ৩০টিরও বেশি সুপারজায়ান্ট ক্ষেত্র রয়েছে, প্রতিটিতে ৫ বিলিয়ন ব্যারেল বা তার বেশি তেল মজুত। নর্থ সি বা রাশিয়ার সেরা কূপগুলোর চেয়েও এই অঞ্চলের কূপগুলো দ্বিগুণ থেকে পাঁচগুণ বেশি তেল উৎপাদন করে।

 

আধুনিক ভূ-বিজ্ঞান এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিলা-গুণাবলি চিহ্নিত করেছে, যেগুলো মূলত একটি অঞ্চলকে তেলসমৃদ্ধ করে তোলে। এর মধ্যে রয়েছে সেগুলোর হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ও ধারণ করার ক্ষমতা। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে গুণাগুণগুলো প্রায় সর্বোত্তম পর্যায়ে রয়েছে। সহজে উৎপন্ন হওয়া এবং প্রাচুর্যের হিসাব করলে, জ্বালানি সম্পদে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের তুলনা হয় না।

 

প্রাচীন ইতিহাস

বরফ যুগের শেষে পারস্য উপসাগর সৃষ্টি হওয়ারও আগে থেকে মানুষ এই অঞ্চলে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি সম্পর্কে জানত। এই অঞ্চলের বহু নদী ও উপত্যকায় স্বাভাবিকভাবেই তেল ও গ্যাসের নির্গমন দেখা যায়। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ ব্যবহার করত বিটুমিন, যা তেলের একটি ভারি রূপ। এটি তখন নির্মাণকাজ এবং নৌকা পানিরোধী করার জন্য ব্যবহৃত হতো।

 

আধুনিক যুগের তেল প্রথম আবিষ্কার হয় ১৯০৮ সালে, ইরানের পঞ্চিমাঞ্চলে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের দ্রুত প্রসার হয়, তখন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানে এত বিপুল জ্বালানির মজুত থাকার সম্ভাবনা নেই। পৃথিবীর আরও কিছু স্থানে, যেমন পশ্চিম সাইবেরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনেও বিপুল তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তবে মজুত ও উৎপাদনের তুলনায় সেগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ধারেকাছেও নেই।

 

ভূতাত্ত্বিক কাঠামো

 

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন এক স্থানে অবস্থিত, যেখানে দুটি মহাদেশীয় প্লেট সংঘর্ষে লিপ্ত—দক্ষিণ-পশ্চিমে অ্যারাবিয়ান এবং পূর্ব ও উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট। প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে এই সংঘর্ষ চলছে, যার ফলে শিলাস্তরগুলো বাঁকানো, ভাঙা এবং গভীরে তাপ ও চাপের কারণে রূপান্তরিত হয়েছে।

 

উপসাগরের দুই পাশে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। ইরানের দিকে জাগরোস পর্বত প্রায় এক হাজার মাইলেরও বেশি ছড়ানো, যা ওমান উপসাগর থেকে তুরস্ক সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। এটি বৃহৎ আল্পস-হিমালয় পর্বতমালার অংশ এবং গত ৬ কোটি বছরে ইউরেশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা, আরব ও ভারতের সংঘর্ষে গঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, আরবীয় অংশে এই ধরনের ভাঙন বা বাঁক ঘটেনি। সংঘর্ষজনিত চাপের মাধ্যমে গভীর ও কঠিন শিলার একটি স্তর বিশাল গম্বুজাকৃতির কাঠামোতে রূপ নিয়েছে, যাকে বেসমেন্ট রক বলা হয়। এটি শত শত বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত।

 

পারস্য উপসাগরের নিচে জাগরোস পর্বত থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত উপাদানে ভরাট একটি অববাহিকা রয়েছে। গভীর অংশগুলোতে উচ্চ তাপ ও চাপ বিদ্যমান, যা তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয়। সামগ্রিকভাবে, এটি বৃহৎ পরিসরে হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য খুবই উপযোগী পরিবেশ।

 

যে শিলা তেল তৈরি করে

 

তেল ও গ্যাস গঠিত হয় সামুদ্রিক জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মতো জৈব উপাদান থেকে, যা শেল, কাদামাটি-সমৃদ্ধ চুনাপাথর এবং অন্যান্য শিলায় জমা হয় এবং উচ্চ তাপ ও চাপে রূপান্তরিত হয়। কোনো শিলায় ২% বা তার বেশি জৈব উপাদান থাকলে তা তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে এমন বহু স্তরের শিলা রয়েছে, যেগুলো ঘন, বিস্তৃত এবং জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, জুরাসিক যুগে গঠিত হানিফা ও তুওয়াইক পর্বতের গঠন এবং ক্রিটেশিয়াস যুগের কাজদুমি গঠন উল্লেখযোগ্য। এসব শিলায় এক থেকে ১৩ শতাংশ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি জৈব উপাদান রয়েছে।

 

তেল ও গ্যাসের কাঠামো

 

এই অঞ্চলের বাঁকানো ও ভাঙা শিলাস্তর এবং গম্বুজাকৃতির কাঠামো হাইড্রোকার্বন আটকে রাখার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। জাগরোস পর্বতমালার ভাঁজগুলোতে শত শত বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। মানচিত্রে দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বমুখী দীর্ঘ, সসেজের মতো আকৃতির ক্ষেত্র, যা মূলত এই ভাঁজ কাঠামোর প্রতিফলন।

 

আরবীয় প্লেটে বৃহৎ গম্বুজ কাঠামোগুলো বিশাল তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র ঘাওয়ার অয়েল ফিল্ড, যেখানে সাত হাজার কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। একইভাবে রয়েছে সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাস ফিল্ড, যা কাতার ও ইরান যৌথভাবে ব্যবহার করে, সেখানে অন্তত এক হাজার তিনশো ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভয়ার শিলাগুলো হলো চুনাপাথর, যার কিছু অংশ আংশিকভাবে দ্রবীভূত হওয়ায় তেল ও গ্যাস চলাচল সহজ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই শিলাগুলো শত শত এমনকি হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত।

 

ভূতাত্বিক বৈচিত্র্য এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে তেল-গ্যাসের মজুত ও উৎপাদনে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল পৃথিবীতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে অনুসন্ধান এবং খননের মাধ্যমে আরও তেল-গ্যাস পাওয়া যাবে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

সূত্র: ফিজিক্স ডট ওআরজি এবং দ্য কনভার্সেশন অবলম্বনে