Image description

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ঐতিহাসিক সরাসরি শান্তি আলোচনা। দুই দেশের যুদ্ধ যখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তখন ৪৭ বছর পর এক দেশের শীর্ষ নেতারা অন্য দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসলেন। ১৯৭৯ থেকে ২০২৬ সাল। এর মধ্যে কমপক্ষে ৪৭টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দুই দেশের নেতাদের একের সঙ্গে অন্যের মুখ দেখাদেখি নেই। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরান। সেই অবস্থা এখনো বর্তমান। অবশেষে এবারের অপারেশন এপিক ফিউরির পর সেই জানালা খুলে গেছে।

জাতিসংঘ, ইসলামিক দেশগুলোর সংগঠন ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক জোটগুলো যখন নীরব তখন দুঃসাহস দেখিয়েছে পাকিস্তান। তারা উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতির সংলাপে বসাতে পেরেছে। এর আগে ৮ই এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের পক্ষ থেকে। তার জন্য অবশ্য তাদেরকে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তান নিজেকে অনেকটা উপরে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও যদি দুই দেশ ইসলামাবাদ সংলাপ থেকে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, সেটা হবে পাকিস্তানের কূটনীতির আরেকটি বড় বিজয়।

একদিকে যখন ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চলছিল তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ইরানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেন। বলেন, তারা ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়েছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করে তা জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। মিডিয়ার খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বেশ কয়েকটি জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করেছে। তবে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বলেছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করলে ৩০ মিনিটের মধ্যে তাতে হামলা করবে তারা। শান্তি আলোচনার মধ্যে ট্রাম্পের ওই জাতীয় মন্তব্যের জন্য তার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই শান্তি আলোচনার ফল কি তা জানা যায়নি।

ওদিকে শান্তি আলোচনা নিয়ে প্রথমে বলা হয়, আলাদা আলাদা রুমে অবস্থান করবেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করবে পাকিস্তান। কিন্তু বার্তা সংস্থা রয়টার্স, ডনসহ বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়, এ অবস্থান থেকে সরে আসেন প্রতিনিধিরা। শেষ পর্যন্ত তারা একই কক্ষে সরাসরি ও মুখোমুখি সংলাপ শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা।

সরাসরি আলোচনা শুরুর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষ করেন। এই দলে নেতৃত্ব দেন ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ইরানের অংশগ্রহণ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রশংসা করেছেন। তিনি পাকিস্তানের ‘সৎ ও আন্তরিক অঙ্গীকার’ পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা অব্যাহত রাখবে, যাতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অর্থবহ অগ্রগতি অর্জন করা যায়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শোহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয়পক্ষের সঙ্গেই পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এতে উপস্থিত ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নাকভি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শনিবার পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক আলোচনায় অংশ নিতে ভ্যান্স ও তার প্রতিনিধিদল সকালে পাকিস্তানে পৌঁছান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাই জারেড কুশনার সহায়তা করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, উভয়পক্ষের গঠনমূলক অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনা ওই অঞ্চলে টেকসই শান্তির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করবে। এতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, পাকিস্তান এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই পক্ষকে সহায়তা করতে তার ভূমিকা অব্যাহত রাখতে চায়। এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নাকভি।

এই আলোচনা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ৮ই এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়।

শনিবার সকাল ১১টার কিছু পর ভ্যান্স নূর খান বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন। সেখানে তাকে স্বাগত জানান ইসহাক দার, মহসিন নাকভি এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দার যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে পক্ষগুলো গঠনমূলকভাবে আলোচনায় অংশ নেবে।

লেবাননে ইসরাইলি হামলা নিয়ে শেষ মুহূর্তের জট কাটার পর শনিবার সকালে ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। তেহরান শর্ত দিয়েছিল- লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা আলোচনায় অংশ নেবে না। পাকিস্তান জানায়, এই বিষয়টি যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলে ভ্যান্স ছাড়াও আছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। এ ছাড়া মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারাও এই দলে রয়েছেন। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন সুপ্রিম ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি আকবর আহমাদিয়ান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দোল নাসের হেম্মতি। এই আলোচনা ১৯৭৯ সালের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ।

একপর্যায়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। কারণ ইরান জোর দিয়ে বলে- লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হলে তারা আলোচনায় বসবে না। শুক্রবার গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, তেহরানের অংশগ্রহণ নির্ভর করছে দু’টি শর্তের ওপর- লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করা। এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, আমরা বৈরুতে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করেছি এটিকে আলোচনায় ‘লাল রেখা’ হিসেবে তুলে ধরে। আবার হামলা হলে আলোচনা বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রধান বিরোধের বিষয়গুলো:

ইরান বলছে, যুদ্ধবিরতি সব ফ্রন্টে প্রযোজ্য হতে হবে, যার মধ্যে হিজবুল্লাহ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননের হামলাকে এই চুক্তির বাইরে রাখছে। এই মতপার্থক্য বারবার আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে। ওয়াশিংটন থেকে রওনা হওয়ার আগে ভ্যান্স বলেন, এই আলোচনা ইতিবাচক হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তিনি সতর্ক করেন, সময়ক্ষেপণমূলক কৌশল গ্রহণ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না। অন্যদিকে ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন, ইরানের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে। তিনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা অব্যাহত রাখার জন্য ইরানের সমালোচনাও করেন।

পাকিস্তানের ভূমিকা:
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তান আলোচনা সফল করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তিনি এই আলোচনাকে সংলাপের মাধ্যমে জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের একটি সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন, তবে কাজটি কঠিন হবে বলেও স্বীকার করেন। আলোচনা ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে হলেও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক উপাদান অপসারণ। অন্যদিকে ইরান চাইছে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনায় কাঠামো, জব্দকৃত অর্থে প্রবেশাধিকার। এ ছাড়া আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠী, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং সমঝোতার ধাপগুলো নিয়েও বিরোধ রয়েছে।

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এত বিস্তৃত ইস্যুর কারণে দুইদিনের এই প্রাথমিক বৈঠকেই বড় অগ্রগতি আসার সম্ভাবনা কম। সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে বা উত্তেজনা কমানোর কিছু প্রাথমিক সমঝোতা হতে পারে। তবুও ইসলামাবাদে এই বৈঠক একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে লেবাননে চলমান সহিংসতা, উপসাগরে জাহাজ চলাচলের সমস্যা এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের গভীর অবিশ্বাসের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো চাপে রয়েছে।