বাজেট প্রণয়ন ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে সরকার। অর্থ বিভাগ বলছে, দেশীয় সম্পদ ও আমদানি করা পণ্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সরকার। অনেক আগে থেকে চলে আসা ডলারসংকট আরও প্রকট হচ্ছে। জ্বালানিসংকট ভোগাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ তো কয়েক বছর ধরেই চলমান। রাজস্ব আদায়ে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে। রপ্তানিও নেতিবাচক ধারায়। সার ও ডিজেল সংকটে কৃষি খাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। ব্যাপকহারে কমে যেতে পারে কৃষি উৎপাদন। রেমিট্যান্স বাদে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই রয়েছে নেতিবাচক ধারায়। ফলে পাল্টে গেছে সরকারের সব হিসাবনিকাশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে। সেখানে ওই সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। এবারের বাজেটেও অন্যান্য সব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এ যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। খোদ অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়তেই পারে। সে প্রস্তুতিও আমাদের থাকতে হবে।
চলমান এ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ সকালে অনলাইনে সরকারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও আর্থিক মুদ্রা কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের এ বৈঠকে পরিকল্পনা, বাণিজ্য, জ্বালানিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকের পর সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কী করা যায় সে সম্পর্কিত পরামর্শপত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জমা দেবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় জ্বালানি খাত নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে পুরো বিশ্ব। যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। কেননা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। অর্থবছরের মাঝামাঝিতে এসে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কোনোরকমে আর্থিক চাহিদা মেটাচ্ছে দেড় মাস বয়সি বিএনপি সরকার। যুদ্ধের কারণে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতও চরমভাবে বিপর্যস্ত। বৈদেশিক শ্রমবাজার তো বন্ধের পথে। দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্প খাতের অবস্থা খুবই করুণ। জ্বালানি পেতে যানবাহনের সারি প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনীতি স্মরণকালের সংকটময় পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কারণে দেশের অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সংকট বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সব হিসাবই উলটপালট করে দিয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অধিক সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে গতি আনতে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই সরকারের পরিকল্পনা ছিল গত কয়েক বছরের রক্ষণশীলতা ও সংকোচন নীতির বাজেট থেকে বেরিয়ে এসে সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়নের। উদার অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্যে নতুন করে গতি ফিরিয়ে এনে বাণিজ্য খাতে স্বস্তি ফেরানো। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়িয়ে প্রান্তিকসহ সব শ্রেণির মানুষকে অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা। আর্থিক খাতের সংস্কারমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখে বন্ধ থাকা সব কারখানা চালু করে ‘ভঙ্গুর ও ফোকলা’ অর্থনীতিকে সচল করার কৌশলও ঘোষণা করেছিল সরকার।
কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হওয়া ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে সৃষ্টি হওয়া বৈশ্বিক সংকট সরকারের সেসব পরিকল্পনা ও হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে। সরকারকে আবারও সেই রক্ষণশীলতার পথ বেছে নিতে হয়েছে। সংকট সামলাতে পতিত সরকারের দেখিয়ে দেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতিই অনুসরণ করতে হচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও।
একদিকে সরকারের মধ্যে চলছে চরম অর্থসংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের সংকট। সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে জ্বালানির বিষয়টি। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাহিদার জোগান দিতে দ্বিগুণের বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে জ্বালানি তেল ও এলএনজি। তবু খুব যে সহজে আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে তা নয়।
জানা গেছে, বুধবারের সভায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। বিশেষ করে চলমান সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর গতিবিধির ওপর একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়া হবে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন, রেমিট্যান্স, রপ্তানি, জ্বালানি খাত পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অগ্রগতি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কী ধরনের নীতি নেওয়া প্রয়োজন হবে এবং বাজেটের কাঠামো ও রূপরেখা কী রকম হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করা হবে। এতে বাজেটের মোট আকার, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য, ঘাটতি বাজেট, ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ ও পরিশোধ, সরকারের নতুন প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল এসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া আসছে বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, মূল্যস্ফীতি, মোট জিডিপি এসব বিষয়ে প্রাথমিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই মোতাবেক বাজেট প্রণয়ন করবে এনবিআর ও অর্থ বিভাগ। যা আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, নানান কারণে এবারের বাজেটটা সরকারের কাছে অধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি। যার বাস্তবায়নের পাইলটিং প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এরপর রয়েছে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। কিন্তু এসব কর্মকা কে রীতিমতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে বৈশ্বিক সংকট। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সরকারকে করণীয় নির্ধারণে বারবার ভাবিয়ে তুলছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমলে নিয়েই আমরা এবার বাজেট করতে চলেছি। এখানে আমাদের নতুন করে কিছু বিষয়ে ভাবতে হবে। এর মধ্যে জ্বালানি খাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হচ্ছে। করের আওতা এমনভাবে বাড়ানো হবে, যাতে নিম্ন শ্রেণির মানুষের ওপর অতিরিক্ত কোনো চাপ না পড়ে।
এ প্রসঙ্গে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, রাজস্ব অর্জন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। করহার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। এ উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকারের নতুন বেতনকাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের পরবর্তী সিদ্ধান্ত একাধিক পর্যায়ের সমীক্ষা ও পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করছে।
অর্থ বিভাগ বলছে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই হবে এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য। সংশ্লিরা বলছেন, যেখানে আয় বাড়ানোই চ্যালেঞ্জ, সেখানে বড় অঙ্কের বাজেটে করের বোঝা বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। সেটি হলে চাপে পড়বেন ব্যবসায়ী-ভোক্তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এ ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ২ শতাংশ) সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো অনুযায়ী মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আয়ের লক্ষ্য ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি (জিডিপির ৮.৪ শতাংশ) এবং এনবিআর থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।