অনড় অবস্থান। পাল্টাপাল্টি হুমকি। পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে আতঙ্ক। তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত এক অগ্নিকুণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের সময় দ্রুত ফুরাচ্ছে। এরপর তিনি পুরো ইরানকে ‘ধ্বংসস্তূপ’ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় মধ্যরাতে (বাংলাদেশের সময় বুধবার ভোর ৬টা) আল্টিমেটাম শেষ হবে। এর আগে যদি কোনো চুক্তি না করে ইরান, তাহলে ‘এ রাতে পুরো একটি সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে’। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমপক্ষে দু’টি ব্রিজ, রেলওয়ে অবকাঠামো এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তা সত্ত্বেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ট্রাম্পের হুমকিতে মোটেও টলেনি ইরান।
পক্ষান্তরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রতিরক্ষায় জীবন দিতে প্রস্তুত ইরানি জাতি। সেই সঙ্গে নিজেও জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন তিনি। তার যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে ‘মানব ঢাল’ তৈরি করে। উল্লেখ্য, ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টায়। এরপর ইরানের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক-সেতু, অবকাঠামো এক রাতের মধ্যে ধ্বংস করে দেয়ার কড়া হুমকি তার। যখন পাঠকের হাতে এই লেখা, তখন ইরানের অবস্থা কি তা আন্দাজ করা কঠিন। ট্রাম্পের এই যুদ্ধ উন্মাদনা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন রাজনীতিকরা তাকে উন্মাদ, পাগল, ভারসাম্যহীন মানসিকতার বলে অভিহিত করছেন।
এর মধ্যে আছেন নিরপেক্ষ সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, সিনেটে সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার প্রমুখ। শুধু তা-ই নয়, এই যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। বিশ্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। এই যুদ্ধ সারা বিশ্বকে প্রভাবিত করছে, ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্ব জুড়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্পের অভিযোগ ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের কাছে এমন অস্ত্র বানানোর মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে উঠেছে ইরান। এমন অভিযোগে ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে ভয়াবহ হামলা শুরু করলেও ইরানে যে পারমাণবিক অস্ত্র আছে বা তাদের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে, সে বিষয়ে নিরেট প্রমাণ হাজির করতে পারেননি ট্রাম্প।
ওদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ট্রাম্প যদি তার আল্টিমেটাম অনুযায়ী ইরানকে ধ্বংস করে দেয়ার হামলা চালান, তাহলে তাতে অসংখ্য সাধারণ মানুষ নিহত হবেন। এটা হবে যুদ্ধাপরাধ। তবে সে সতর্কতাকেও তোয়াক্কা করছেন না ট্রাম্প। তিনি যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। এই যুদ্ধে তিনি ন্যাটো, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের এবং ইউরোপিয়ান মিত্রদের সহায়তা চেয়ে বিমুখ হয়েছেন। তারা কেউ তার সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। জানিয়ে দিয়েছে, ‘এ যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়’। তাতে ট্রাম্প আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছেন তিনি। তারপরও যখন কিছুতেই ইরানকে বাগে আনতে পারছেন না, তখন একের পর এক আল্টিমেটাম দিতে থাকেন। আর সময় বাড়ান। কিন্তু সর্বশেষ আল্টিমেটামের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল। দৃশ্যত তার হুমকিতে ভীত নন ইরানিরা। দেশের প্রতিরক্ষায় এক কোটি ৪০ লাখের বেশি ইরানি প্রাণ দিতে প্রস্তুত। এভাবেই ট্রাম্পের হুমকির পাল্টা জবাব দিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘এ পর্যন্ত ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি গর্বিত ইরানি তাদের জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতি ঘোষণা করেছেন। আমিও অতীতে করেছি, এখনো করছি এবং ভবিষ্যতেও ইরানের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকবো।’ নাগরিকদের এই আহ্বান ‘জানফাদা (জীবন উৎসর্গ) ফর ইরান’ নামের একটি প্রচারণার অংশ। এই প্রচারণা গত মাসে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চালু করা হয় এবং এর লক্ষ্য জাতীয় ঐক্য জোরদার করা। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সময়সীমা দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সব বড় ধরনের ঘাঁটি বা স্বার্থে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরান। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এক রাতের মধ্যেই ইরানকে বোমা মেরে ধ্বংস করে দিতে পারেন।
অন্যদিকে ইরানের যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী তরুণদের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে ‘মানব ঢাল’ তৈরি করেন। হরমুজ প্রণালি না খুললে ইরানের অবকাঠামোতে বোমা হামলা চালাতে ট্রাম্প বদ্ধপরিকর। তারই জবাবে এমন অবস্থান নিচ্ছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস ট্রাম্পের দেশ ধ্বংসের হুমকিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে ইরানের পুরো ট্রেন নেটওয়ার্কে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তারা ইরানিদেরকে ট্রেন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়। ফলে ইরানি জনগণকে ট্রেনে না চড়তে বা এর আশপাশে না থাকার জন্য সতর্ক করেছে ইরান সরকারও। ওদিকে সৌদি আরবকে বাহরাইনের সঙ্গে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ দ্য কিং ফাহাদ কজওয়ে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। ফলে মঙ্গলবার দিনের শুরুতে তা বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
এই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ২৫ কিলোমিটার। সৌদি আরবের সঙ্গে এটিই বাহরাইনের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র ব্রিজ। বাহরাইন হলো যুক্তরাষ্ট্রের ৫ম ফ্লিটের অবস্থান। ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডামের আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক আইনের সহকারী প্রফেসর মারিইকি ডি হুন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যদি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে তা যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে বোমা মেরে প্রস্তুর যুগে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এমন হুমকি এটাই বলে দেয় যে, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে হবে এই হামলা।
এটা হতে পারে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ইরানের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে সুরক্ষিত রাখতে একটি প্রস্তাবতা নিয়ে মঙ্গলবার ভোট হওয়ার কথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। তবে এতে ভেটো দেয়ার কথা চীনের।
ওদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, কমান্ডারদের হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও ইরানের বাহিনীকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। সোমবার ভোরে বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মাজিদ খাদেমি নিহত হওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন। খামেনি বলেন, খাদেমি নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নীরব ও নিবেদিত সেবায় কয়েক দশক কাটিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তবুও ইসলামী ইরানে সত্যের পথে লড়াইরত যোদ্ধারা অবিচ্ছিন্ন থাকবে। আত্মত্যাগী সশস্ত্রবাহিনী এমন এক শক্তিশালী ও গভীরভাবে প্রোথিত ফ্রন্ট গঠন করেছে, যা সন্ত্রাস ও অপরাধ তাদের জিহাদি আদর্শের প্রতি দৃঢ় সংকল্পকে একটুও টলাতে পারবে না। খামেনির এই মন্তব্য একটি লিখিত বিবৃতিতে এসেছে। তিনি তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এখনো জনসমক্ষে দেখা দেননি।