Image description

একবিংশ শতাব্দীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে, মানবজাতি যখন প্রজ্ঞা, মানবাধিকার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম উৎকর্ষে নিজেকে আসীন করছে, ঠিক তখনই ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাগৃহে এক আদিম ও প্রাগৈতিহাসিক পাশবিকতার পুনরুত্থান ঘটছে। একদিকে বিজ্ঞানের অদম্য অভিযাত্রায় মহাকাশ জয়ের স্পর্ধা, আর অন্যদিকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত মধ্যযুগীয় বর্বরতায় নিমজ্জিত হওয়া-সভ্যতার এই চরম বৈপরীত্য বা আজ বিশ্ববিবেকের সামনে এক তীব্র অস্তিত্ববাদী সংকটের জন্ম দিয়েছে।

সমপ্রতি ডনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেয়ার’ যে হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে, তা কেবল একটি কূটনৈতিক বিচ্যুতি নয়-বরং এটি আধুনিক সভ্যতার তথাকথিত মানবিক গরিমার গালে এক সুতীব্র চপেটাঘাত।
ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকার জ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনে বিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছের। রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, সাদী সিরাজী এবং ফেরদৌসি তাদের সৃষ্টিকর্ম আজও মানবতা, প্রেম ও প্রজ্ঞার এক অমলিন আলোকবর্তিকা। সেই জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার হুমকি কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নয়, মানবিক চেতনার ওপর এক গভীর আঘাত।

পারস্যের যে গৌরবময় উত্তরাধিকার জ্ঞান, বিজ্ঞান ও স্থাপত্যে বিশ্বসভ্যতাকে ঋণী করেছে, তাকে নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার এই হুমকি কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কের ভাষা হতে পারে না। এটি বরং ক্ষমতার দম্ভে উচ্চারিত এক বিপজ্জনক অসংযম, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও মানব চিন্তার একটি অংশ এখনো আদিম হিংস্রতার শিকলে আবদ্ধ।

এই হুমকি কেবল ইরানের বিরুদ্ধে নয়; এটি সমগ্র মানবসত্তার প্রতি এক অবমাননা। সভ্যতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে-আমরা কি আবার সেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ বাস্তবতায় ফিরে যাচ্ছি? বিশ্ববিবেকের নীরবতা কি তবে এই উন্মত্ততাকে পরোক্ষ স্বীকৃতি দিচ্ছে?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-কোনো সভ্যতাকে কেবল অস্ত্র দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। কিন্তু যখন শক্তিধর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে এমন ভাষা উচ্চারিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি যে কতোটা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শক্তির অহংকার যখন মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা আর রাজনীতি থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক বিপজ্জনক উন্মাদনা।

তবে এই উগ্র ভাষার পেছনে কেবল আবেগ বা উন্মত্ততা নয়, একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলও কাজ করে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডনাল্ড ট্রাম্প এই ধরনের কঠোর ভাষা ব্যবহার করে নিজেকে ‘দৃঢ় ও আপসহীন নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা তার সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তা ও জাতীয় গৌরবের অনুভূতিকে উস্কে দেয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি একটি কৌশলগত সংকেত-প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, চাপ সৃষ্টি করা এবং আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থান অর্জনের প্রচেষ্টা। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের হুমকি সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়, বরং একটি দরকষাকষির কৌশল (bargaining tactic)। তবে এই কৌশল যতটা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ এনে দিতে পারে, ততটাই দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

জাতিসংঘের সনদ থেকে শুরু করে জেনেভা কনভেনশন-সবকিছুর ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা। একটি দেশকে ধ্বংস করার হুমকি এই মৌলিক নীতিগুলোকেই অস্বীকার করে। যদি শক্তির দম্ভই চূড়ান্ত সত্যে পরিণত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তির সকল প্রচেষ্টা অর্থহীন হয়ে পড়বে।
ইরান কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়; এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার হুমকি আসলে আমাদের সম্মিলিত মানবিক উত্তরাধিকারের ওপর আঘাত। যখন ধ্বংসকে “কৌশলগত সাফল্য” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সভ্যতার নৈতিক পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই ধরনের আগ্রাসী রাজনীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধং দেহী মনোভাব যখন কূটনীতিকে প্রতিস্থাপন করে, তখন সাধারণ মানুষ পরিণত হয় ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত এক নিঃশব্দ উপাদানে। তবু আমরা বিশ্বাস করি কোনো সভ্যতাকে ধ্বংসের আগুন দিয়ে বিলুপ্ত করা যায় না।
আজ সময় এসেছে এই উন্মত্ততার বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান গ্রহণের। বিশ্বনেতৃত্ব এবং বিবেকবান মানুষকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আমরা কি শক্তির দম্ভের শিবিরে দাঁড়াবো, নাকি ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পক্ষে একত্রিত হয়ে এক নতুন সভ্যতার আলো জ্বালাবো?