ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা আইডিএফের অন্যতম রহস্যময় ও গোয়েন্দা শাখা ‘ইউনিট ৫০৪’। এতদিন এই ইউনিটের কমব্যাট টিমে কেবল পুরুষদেরই আধিপত্য ছিল। তবে সেই ‘কাঁচের দেয়াল’ ভেঙে প্রথমবারের মতো শত্রু ভূখণ্ডের (লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, পশ্চীম তীর, গাজা) গভীরে চালানে অভিযানে অংশ নিয়েছেন নারী যোদ্ধারা। সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজেদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এই নারী গোয়েন্দা সৈনিকরা।
প্রথম নারী কমান্ডার
লেফটেন্যান্ট আর (ছদ্মনাম) যিনি ইউনিট ৫০৪-এর ইতিহাসের প্রথম নারী টিম কমান্ডার। তার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একদল নারী যোদ্ধা সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী একটি দেশে প্রবেশ করেন। তিনি একা নন; পাশে বসে আছেন তার নারী সার্জেন্ট। আর পেছনের সিটে রয়েছেন একজন কেইস অফিসার এবং কমব্যাট টিমের সদস্যরা, যাদের সবাই পুরুষ।

তারা এখন আরেকটি দেশের ভেতরে গিয়ে একটি দলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন। কেইস অফিসারের আশা, তিনি তাদের ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হিসেবে নিয়োগ করতে পারবেন। এটাই ইউনিট ৫০৪-এর মূল লক্ষ্য।
লেফটেন্যান্ট আর সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, সপ্তাহের শুরুতে ইউনিট থেকে আমাকে বলা হলো— ‘আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিশন আছে যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তুমি এতে অংশ নিচ্ছ, এবং তা সাধারণ কোনো ভূমিকা নয়।’ তারা আমাকে বলেছিল যে, একজন নারী এবং একজন লড়াকু সৈনিক হওয়ার সুবাদে আমি এখানে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করব।
সেখানে আসলে কী ঘটেছিল?
এটি ছিল কেইস অফিসার এবং এমন একদল নারী-পুরুষের মধ্যে প্রথম বৈঠক, যাদের আগে কখনো ইসরায়েলের সাথে যোগাযোগ ছিল না। লক্ষ্য ছিল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ। আমার ও সার্জেন্টের কাজ ছিল নারীদের দল থেকে আলাদা করা। তাদের সাথে কথা বলা ও তাদের দেহ তল্লাশি করা— যাতে তারা কোনো লুকানো অস্ত্র বহন না করে, যা আমাদের বাহিনীর জন্য বিপদ হতে পারে।

লেফটেন্যান্ট আর বলেন, আমি রোমাঞ্চিত ছিলাম, আবার কিছুটা চিন্তিতও। কিন্তু আমি তা প্রকাশ করিনি। আমি সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমি নিজের ও দলের প্রতিটি সদস্যের সীমাবদ্ধতা জানতাম। যাদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলাম, বিশেষ করে সেই নারীদের সম্পর্কে প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য—তাদের প্রাথমিক পরিচয়, বয়স ও পরিবার সব আমি মুখস্থ করে নিয়েছিলাম।
তিনি জানান, যাত্রাটি ছিল দীর্ঘ। অপরিচিত ভূখণ্ডে নেভিগেশন অনুসরণ করতে হয়েছিল। গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তিনি বলেন, আমরা বুঝতে পারলাম যে মুহূর্তটি চলে এসেছে। আমাকে এখন সবচেয়ে তীক্ষ্ণ এবং মনোযোগী হতে হবে, কোনো ভুল করা চলবে না।
গাড়ির ভেতরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে লেফটেন্যান্ট আর বলেন, সব কিছু বেশ টানটান পরিস্থিতে ছিল। পিস্তল ও ম্যাগাজিন চেক করা, সিরামিক ভেস্ট শক্ত করে বাঁধা ও মাস্ক পরা।
লেফটেন্যান্ট আর. মনে মনে সব পরিকল্পনা ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন ও সার্জেন্টকে ব্রিফ করছিলেন। আইডিএফের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কেস অ্যান্ড রেসপন্স’—অর্থাৎ যেকোনো পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে কী করতে হবে, তার মহড়া দিচ্ছিলেন তারা।
তারা দ্রুত এবং নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নামলেন। মাস্ক পরা অবস্থায় হাতে অস্ত্র নিয়ে তারা জটিল পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে থাকলেন। নাইট ভিশন চশমা দিয়ে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা হলো।
লেফটেন্যান্ট আর বলেন, আমরা এলাকাটি নিরাপদ কিনা নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী ধাপে এগোলাম, যেসব মানুষের সাথে প্রথম যোগাযোগ যারা আগে কখনও ইসরায়েলিদের দেখেনি। আমি ও সার্জেন্ট নারীদের কাছে গেলাম। কুশল বিনিময়ের পর তাদের পুরুষদের থেকে আলাদা করা হলো। দেহ তল্লাশি শেষে আমাদের নিরাপত্তার ঘেরাওয়ে কেইস অফিসারের সাথে তাদের বৈঠক শুরু হলো।
তারা কি তল্লাশিতে রাজি হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ। সহযোগিতার অংশ হিসেবে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তারা জানত যে মূল বৈঠকের আগে তাদের কিছু ধাপ পার হতে হবে।
ইসরায়েলকে এসব গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার বিনিময়ে তারা কী পায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি বিভিন্ন রকম হতে পারে— টাকা, নিরাপত্তা কিংবা ইসরায়েলে থাকা পরিবারের সাথে দেখা করার সুযোগ বা উন্নত চিকিৎসা সহায়তা।

বৈঠক শেষে দলটি নিশ্চিত করে যে সেই মানুষগুলো নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে। এরপর তারা আবার বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তের দিকে রওনা হয়। এসব মিশনে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে— হঠাৎ কোনো চেকপোস্ট বা কেউ এই বৈঠকের খবর ফাঁস করে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পর তারা নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরে আসেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি কেবল আরেকটি গোপন অভিযান মনে হতে পারে, কিন্তু সেই দুই নারীর জন্য এটি ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
কেন এই আকস্মিক পরিবর্তন?
ইউনিট ৫০৪ হলো ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের অন্যতম গোপন ইউনিট। এর প্রধান কাজ হলো ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ বা মানবিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। সহজ কথায়, এদের কাজ হলো মানুষকে (ইসরায়েলের শত্রুপক্ষকে) তথ্য দিতে রাজি করানো। এই ইউনিট সিরিয়া, লেবানন, পশ্চিম তীর এবং ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজাতেও সক্রিয়।
এরা মূলত বন্দি ও এজেন্ট এই দুই উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাৎক্ষণিক তথ্য বের করা হয়। আর এজেন্টরা হলো সেই সব ব্যক্তি যারা স্বেচ্ছায় বা প্ররোচণায় ইসরায়েলকে তথ্য দেয়। প্রতিটি এজেন্টের জন্য একজন ‘কেইস অফিসার’ থাকেন। কিন্তু কেইস অফিসার কখনো একা কাজ করেন না। তাকে সুরক্ষা দিতে একটি বিশেষ দল থাকে। আগে এই দলে কেবল পুরুষরাই থাকত, এখন নারীরাও যোগ দিচ্ছেন।
কেন এখন নারীদের নেওয়া হচ্ছে?
ইউনিটের কমব্যাট ডিভিশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ওয়াই. বলেন, ৭ অক্টোবর আমাদের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমরা কেবল একটি সহজ প্রশ্ন করেছিলাম- নারী কেন নয়?
তিনি আরও যোগ করেন, নারীদের একটি বড় সুবিধা হলো তারা পরিবেশে খুব দ্রুত মিশে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ওপর সন্দেহ কম হয়, যা আমাদের এমন এক অপারেশনাল ফ্লেক্সিবিলিটি দেয় যা আগে ছিল না।
কয়েকজনের পরিচয়
>> আনাত (ছদ্মনাম): ২২ বছর বয়সী এই মেয়েকে দেখে কেউ কল্পনাও করবে না যে তিনি ভিন দেশে গিয়ে কাউকে ঘায়েল করতে পারেন। তাকে বাছাইয়ের সময় একজন মনোবিজ্ঞানী জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমাকে দেখতে খুব শান্ত ও কোমল মনে হয়। তুমি এই কঠিন ইউনিটে কীভাবে খাপ খাওয়াবে?
আনাত উত্তর দিয়েছিলেন, আপনি কেন মনে করেন যে এই কোমলতা আমার সীমাবদ্ধতা হবে?
>> অরলি: ২১ বছরের এই মেয়ে একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে বড় হয়েছেন। তিনি তিন বছর ধরে ট্রায়াথলন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যা তাকে মানসিকভাবে ইসরাত কঠিন করেছে।
তিনি বলেন, আমি যখন বাড়ি যাই, আমি চাই তেলআবিবে বসে কেউ নিশ্চিন্তে কফি খাক বা কোনো মা তার সন্তানের সাথে পার্কে খেলুক। আর আমি জানি যে তারা শান্তিতে আছে কারণ আমরা সীমান্তে পাহারা দিচ্ছি।
>> মায়া: ২০ বছরের এই তরুণী অত্যন্ত দেশপ্রেমিক পরিবারে বড় হয়েছেন। ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার পর তার দেশের জন্য কিছু করার জেদ আরও বেড়ে যায়। প্রশিক্ষণের সময় তার পায়ে গুরুতর চোট লেগেছিল, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।

৯ মাসের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ও বিশেষ প্রশিক্ষণ
ইউনিট ৫০৪-এর এই নারী যোদ্ধাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া আইডিএফের অন্যতম কঠিন কোর্স। ৯ মাসের এই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে আরবি ভাষায় পারদর্শিতা এবং স্থানীয়দের মতো পোশাক ও আচরণ শিখতে হয়।
দীর্ঘ ও স্বল্প পাল্লার আগ্নেয়াস্ত্র চালনা এবং সামনাসামনি লড়াই (ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট) করার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। তারা একে অপরকে নামে ডাকেন না। এমনকি প্রশিক্ষণের সময় থেকেই তারা চোখের ইশারায় বা সংকেতে যোগাযোগ করতে অভ্যস্ত হন, যাতে পরিচয় ফাঁস না হয়। ছোট দলে ভাগ হয়ে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় মিশনে পারদর্শিতা অর্জন করতে হয়।
সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা জয়
এই টিমের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আর ও গোয়েন্দাকর্মী অরলি দুজনেই রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার থেকে এসেছেন, যেখানে নারীদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়াকে ভালো চোখে দেখা হয় না।
অরলি বলেন, আমার স্কুলের বন্ধুরা জানলে হয়তো গর্বিত হবে না, কিন্তু আমি জানি আমি দেশের জন্য কী করছি।
মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য অরলি তিন বছর ট্রায়াথলন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
প্রশিক্ষণ ও অভিযানের দীর্ঘ সময় এই নারী যোদ্ধাদের একটি পরিবারে পরিণত করেছে। তারা এখন কেবল সহকর্মী নন, বরং ‘সিস্টার্স ইন আর্মস’ বা যুদ্ধের ময়দানের বোন। বর্তমানে তারা সিরিয়া, লেবানন, পশ্চিম তীর এবং গাজা সীমান্তে নিয়মিত কাজ করছেন।