জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে চলছে তেলেসমাতি কারবার। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে সারা বিশ্বের অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশে সে ঢেউ লেগেছে। সে সুযোগ নিয়ে অসৎ কিছু ব্যবসায়ী তেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবারে মেতে উঠেছে। এতে করে গ্রাহকদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসের তেল আছে, আপাতত দাম বাড়ছে না। জ্বালানি মুজত ও কালোবাজারে ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেলের মজুত করায় বাজারে কিছুটা সঙ্কট সষ্টি হয়েছে। জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেটের বিস্তার এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, সরকারি ডিপোতে পাওয়া গেছে হিসাবের বাইরে গোপনে মজুত করা তেল। বিভিন্ন এলাকায় গোপনে মজুত করা তেল উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে তেল আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে সাগরপথে বিপুল জ্বালানি তেল নিয়ে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। ভারত থেকে দুই দফায় পাইপ লাইন দিয়ে ডিজেল এসেছে। তারপরও জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে তোলপাড়। পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল বিক্রি, বিক্রিতে তদারকি, জেলায় জেলায় তদারকি টিম গঠন, কিছু পাম্পে বিজিবি মোতায়েন এবং অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যের কাছ থেকে বিপুল জ্বালানি উদ্ধার করেছে। এমনকি জ্বালানি পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, ২৮ মার্চ থেকে জ্বালানি বিক্রি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পাম্পগুলোতে জ্বালানির সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগÑ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বালানি নিতে হচ্ছে। তারপরও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। পাম্পের মালিকদের দাবি সরবরাহ কম হওয়ায় সঙ্কট হচ্ছে। তবে যতটুকু পাচ্ছি সবটুকু জ্বালানি বিক্রি করেও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। ইনকিলাবের সারা দেশের জেলা-উপজেলায় কর্মরত প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, সবখানে জ্বালানি সঙ্কট রয়েছে। কোথাও পাম্পের সীমিত পরিমাণ তেল বিক্রি হচ্ছে, কোথাও স্বাভাবিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ এলাকার পাম্পে দীর্ঘ লাইন। এদিকে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর পাম্পে এখন জ্বালানি সরবরাহই করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এরপরও কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
রাজধানী ঢাকার তেলের পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকদের অভিযোগÑ তদারকির অভাব আর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই তেলের সঙ্কট তীব্র হচ্ছে। তাদের দাবি, তেলের মজুত সম্পর্কে সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে রাজধানীর পাম্পগুলোর বাস্তব চিত্রের কোনো মিল নেই। এদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, সরবরাহ ঘাটতিই এই সঙ্কটের মূল কারণ।
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের সঙ্কট প্রকট হয়েছে। তেজগাঁওয়ের সাউদার্ন ফিলিং স্টেশন ও পরীবাগ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কেউ কেউ ভোররাত থেকে অপেক্ষা করেও কাক্সিক্ষত জ্বালানি পাননি। টিকাটুলি হাই অ্যান্ড হাই পাম্পের দেখা যায় দিনের বেশির ভাগ সময় জ্বালানি বিক্রি বন্ধ। তবে মাঝে মধ্যে কিছু তেল বিক্রি করা হচ্ছে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একজন গ্রহক বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যস্ত করে ইনকিলাবকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ৩টা থেকে পাম্পে বসে আছি, এখনো তেল পাইনি। আমাকে তো অফিসেও যেতে হবে।’
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি বছরে তিন ধাপে ১৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল তেল আনা হয়েছে। সর্বশেষ পাইপলাইনে ডিজেল এসেছে ২৮ মার্চ প্রায় সাত হাজার মেট্রিক টন। এর আগে ২৭ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক লিটার বা পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসে পৌঁছায়। জ্বালানি তেল সরবরাহ ঠিক রাখার লক্ষ্যে শুক্রবার ছুটির দিনেও ডিপো খোলা রাখে কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২৪ মার্চ দুপুরে ভারতের আসামে অবস্থিত নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রেলহেড অয়েল ডিপোতে ৫৭ লাখ লিটার বা পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়।
এদিকে গত ২৬ মার্চ দেশের বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চলমান সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে আরো একটি জাহাজে করে দেশে এসেছে ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল। এদিন ১০ হাজার টন ডিজেল ও ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে দেশে পৌঁছেছে ‘এমটি গ্রান কুভা’ নামে একটি জাহাজ। চুক্তি অনুযায়ী, এই জ্বালানি সরবরাহ করেছে ইউনিপেক নামে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও নতুন এই চালান কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জানা গেছে, আগামী এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে তিনটি পার্সেলের মাধ্যমে মোট তিন লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত মাত্র এক লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এছাড়া, আগামী মে মাসে ১৭টি জাহাজে সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে অস্থিরতার মধ্যেই সরকারি একটি ডিপোতে পাওয়া গেছে হিসাবের বাইরে গোপনে মজুত করা তেল। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে (ডিপো) অভিযান চালিয়ে তেলের এ মজুত শনাক্ত করা হয়। ডিপোটিতে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল পাওয়া যায়। এ অবস্থায় এই ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ।
রফিকুল ইসলাম সেলিম, চট্টগ্রাম থেকে জানান, সরকারি তরফে সঙ্কট নেই দাবি করা হলেও চট্টগ্রামে জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার বেড়েই চলেছে। মহানগরী এবং জেলার বেশির ভাগ পেট্রোল পাম্পে তেল মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যপ্ত জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সাথে পাম্প-কর্মীদের হাতাহাতি-মারামারির ঘটনাও ঘটছে। তেলের অভাবে গণপরিবহন চলাচল বিঘিœত হচ্ছে। বেশি বিপাকে পড়েছেন রাইড শেয়ার মোটরসাইকেল চালকরা। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল থকমে গেছে ডিজেলের অভাবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা বড় জাহাজ থেকে আমদানি পণ্য খালাস ও পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ী ও পেট্রোল পাম্প মালিকরা জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত গড়ে তুলছে। ফলে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আবার বেশির ভাগ গ্রাহক আতঙ্কে বেশি তেল কিনছেন। গ্রাহক পর্যায়েও তেল মজুতের অভিযোগ রয়েছে। তেলের ট্যাঙ্কি একটু খালি হতেই লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকে। তাতে বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোল পাম্প আছে ৩৮৩টি। এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন। প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পাম্প আছে ৪৬টি।
গতকাল নগরীর কয়েকটি এলাকায় ঘুরে কিছু পেট্রোল পাম্প বন্ধ পাওয়া গেছে। পাম্পের কর্মীরা বলছেন, তেল আসলে পাম্প চালু হবে। কোথাও আবার তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। কোনো কোনো পাম্পে ‘অকটেন নেই’ লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
মহসিন রাজু, বগুড়া থেকে জানান, জ্বালানি তেল পাওয়া যাবে না মর্মে শঙ্কা থেকে বগুড়ার বেশির ভাগ কার, মাইক্রো, মোটরবাইক মালিক প্রয়োজনের চাইতে বেশি তেল কিনছেন। যার ফলে বগুড়ার ফিলিং স্টেশনগুলোতে দ্রুত শেষ হচ্ছে পেট্রোল অকটেন। যানবাহন মালিকদের দাবি, পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল থাকলেও বিক্রি বন্ধ রেখেছেন মালিকরা। যে কারণে বিভিন্ন পাম্প ঘুরে ঘুরে হয়তো একটিতে তেল পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে পেট্রোল পাম্পের মালিকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের ঘাটতির কথা শুনে বেশির ভাগ যানবাহনের মালিক প্রয়োজনের চাইতে বেশি তেল কিনছেন। এ কারণে ১০ থেকে ১৫ দিনে যে তেল বিক্রি হতো, সেটি এখন দুই থেকে তিন দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ফয়সাল আমীন, সিলেট থেকে জানান, সিলেটে জ্বালানি তেলের ডিপোসমূহে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিজিবি। এছাড়া নির্ধারিত শর্তে সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় মোটরসাইকেলে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত জারি করেছে পুলিশ।
এদিকে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে; কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে ভোগান্তি বেড়েছেÑ এমন দাবি করলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, সিলেট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান। তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা সিলেটের মার্কেটিং কর্মকর্তা সৈয়দ আলম বলেন, পেনিক থেকে সারা দেশে তেল নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সঙ্কট-গুজব। তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ সিলেটে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। সঙ্কট নেই।
শামসুল হক শারেক, কক্সবাজার থেকে জানান, কক্সবাজার জেলার অন্তত ২৮টি পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি পাম্পে সীমিত আকারে তেল সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প, নিত্যপণ্য পরিবহন ও জনজীবনে এর বিরূপ প্রভাব আরো গভীর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আসাফুর রহমান কাজল, খুলনা থেকে জানান, খুলনার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। অনেক চালক অভিযোগ করেন, কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছেন না। এতে তাদের দৈনন্দিন আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খুলনার পেট্রোল পাম্পগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
আনোয়ার জাহিদ, ফরিদপুর থেকে জানান, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে তেল পাম্প মালিকরা পাম্প বন্ধ করে রেখে ‘তেল নেই’ এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছেন জেলার একাধিক তেল পাম্পে। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তেল নেই পাম্প বন্ধ এমন নোটিশ টানানো দেখে বিভিন্ন গাড়ির মালিক হতাশ হয়ে পড়ছেন। ফলে পাম্পে শত শত বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ করা গেছে ।
সাদিক মামুন, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লা নগরী ও উপজেলাগুলোতে জ্বালানি তেলের সঙ্কট এখন ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র ভোগান্তি তৈরি করেছে। তেল নেয়ার লাইন ও অগ্রাধিকার নিয়ে পাম্পগুলোতে হাতাহাতি এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে এ সঙ্কট ক্রমেই বাড়ছে। পাম্পে তেল না থাকলেও খোলা বাজারে ১৫০-১৮০ টাকায় তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে সিন্ডিকেটের প্রভাব ও সরবরাহের অভাবে পাম্পে তেল না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন পাম্পে তদারকি বাড়িয়েছে।
আবদুল হালিম আনসারি, রংপুর থেকে জানান, রংপুর জেলার প্রায় তেল পাম্পই বন্ধ। কয়েকটি পাম্পে তেল মিললেও দীর্ঘ লাইন ধরে তা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল, কার ও মাইক্রোবাস চালকরা। পর্যাপ্ত তেল না পেয়ে ক্ষোভে পাম্প থেকে ফিরে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে, জ্বালানি তেল মজুতের অপচেষ্টা রোধ ও জ্বালানি তেল বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণে কিছু কিছু তেলের ডিপোগুলোসহ কিছু কিছু পেট্রোল পাম্পে গত শনিবার থেকে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ থেকে জানান, ঝিনাইদহ জেলার ৩৬টি ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভোর থেকে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় মোটরসাইকেল চালকদের। অভিযোগ উঠেছে, গুজব ছড়িয়ে তেল মজুত এবং একাধিকবার তেল নেয়ার কারণে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এতে প্রকৃত কৃষকরা ডিজেল না পেয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে।
মৌলভীবাজার জেলা সংবাদদাতা জানান, মৌলভীবাজারের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে তেল পাচার রোধ করা এবং শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসির আওতাধীন তিনটি অয়েল কোম্পানির নিরাপত্তায় তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
মো. দেলোয়ার হোসেন, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবৈধভাবে প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল মজুত করে রাখার অপরাধে আবুল হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন উপজেলা এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহিম শাহরিয়ার।
কাউছার মাহমুদ, নরসিংদী থেকে জানান, নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের সঙ্কট দেখা দেয়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পাম্পে তেল সরবরাহ রয়েছে, সেখানে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও চালকরা।
মানিকগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, দেশে তীব্র তেলের সঙ্কটে মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও পুরো পরিবহন খাত এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
মশিউর রহমান, নড়াইল থেকে জানান, নড়াইলে ট্রাকে তেল দিতে না পারায় তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরদারকে (৩৩) ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী জিহাদ মোল্যা (২৭) গুরুত্ব আহত হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের নড়াইল-যশোর সড়কের তুলারামপুর রেলব্রিজের সন্নিকটে এ ঘটনা ঘটে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, তেল মজুত প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী তেলের ডিপো পাহাড়ায় সেনাবাহিনী ও পাম্পগুলোতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্যাগ অফিসার নিয়োগ।
জ্বালানি তেল মজুত প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাসহ ২০টি জেলাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো পাহাড়ায় তিন প্লাটুন সেনাবাহিনী মোতায়েন ও জেলার ২৪টি তেল পাম্পে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। একই সাথে বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো তদারকিতে সার্বক্ষণিক একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।
ঈশ্বরদী (পাবনা) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, পাবনার ঈশ্বরদীতে বেশির ভাগ পাম্প তেল না থাকার কারণে বন্ধ থাকে। দিনের বেলায় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু পাম্প ২০০ টাকা পরিমাণে তেল দিচ্ছে। ২০০ টাকার তেল নিতে এক থেকে দুই ঘণ্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তেল নিতে আসা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
আসলাম পারভেজ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) থেকে জানান, জ্বালানি তেলের অপচয় রোধ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত শনিবার রাতে হাটহাজারীর প্রতিটি পাম্পগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ট্যাক অফিসারদের নামের তালিকা পৌঁছানো হয়।
মো. মহিউদ্দীন, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে জানান, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় জ্বালানি তেল বিক্রি ও মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি জোরদার করেছে উপজেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অধিকাংশ ছোট দোকানেই ‘তেল নেই’ বলে ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ গোপনে পরিচিতদের কাছে প্রতি লিটার পেট্রোল ও অকটেন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর তিনটি তেল পাম্পে পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।