দেশের আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে একগুচ্ছ সংস্কার ও উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদশে ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, র্স্টাটআপ তহবলি গঠন এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি সন্তোষজনক হলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি নেতিবাচক। নির্বাচনের পর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ড্রিভেন অর্থনীতি গড়ে তোলার যে আকাঙ্খা ছিল, তা অর্জনে আমরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলো! বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি জানান, ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা প্রথম অগ্রাধিকার। দ্বিতীয় অগ্রাধিকারে রয়েছে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি করা, এজন্য দু-একদিন পর পর মিটিং হচ্ছে। বেশিরভাগ ব্যাংক এনডিএ স্বাক্ষর করেছে, বাকিরাও করবে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থনীতি বিটের সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় গর্ভনর এ কথা বলেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়রে মধ্যেই তিনি অভ্যন্তরীণ ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ব্যাংকিংখাতকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যায় এবং নীতিনির্ধারণে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা যায়। তার ভাষায়, কোনো অবস্থাতেই রাজনতৈকি চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অবস্থান বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অনেকটা সহজ হবে।
ব্যাংকিংখাতের বড় চ্যালঞ্জেগুলোর মধ্যে একটি হলো পাচার হওয়া অর্থ বা স্টোলেন অ্যাসেট পুনরুদ্ধার। গর্ভনর স্বীকার করনে, এ কাজ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হলেও চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর দ্রুত পুর্নগঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য নতুন বোর্ড গঠন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়োগ এবং রাজনৈতিকি প্রভাবমুক্ত পরিচালনা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো- ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এদিকে উদ্যোক্তা উন্নয়নেও নতুন দিক উন্মোচন করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একটি স্টার্টআপ ফান্ড চালুর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য ৬০০ কোটি টাকার স্টার্ট আপ ফান্ড থেকে আগামী জুনে ঋণ বিতরণ শুরু হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ বা তার বেশি না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে না উল্লেখ করে তিনি জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার জন্য গ্রাম অঞ্চলে চাহিদা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে বা তার আগে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো চালু করতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে ডিসেন্ট্রালাইজড করার চেষ্টা করছি, এগ্রি বেজড ইন্ডাস্ট্রি, এগ্রি টেকনোলজিতে বাড়তি ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এসএমইখাতের জন্য একটি সাবসিডাইজ ফান্ড গঠনের কথা ভাবছি। রিজার্ভ সেফ জোনে আছে এবং এক্সচেঞ্জ রেটে বড় ধরণের ডিপ্রিসিয়েশন চাচ্ছি না বলেও উল্লেখ করেন গভর্নর।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বতি করতে তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা। গভর্নর মনে করেন, বন্ধ কারখানাগুলো জাতীয় সম্পদ, তাই সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বর্পূণ। একই সঙ্গে এসএমই খাতে সহজ শর্তে ঋণ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদন এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশের আর্থিক লেনেদেনে একটিমাত্র কিউআর কোড থাকবে জানিয়ে গভর্নর বলেছেন, এই বাংলা কিউআর কোড ১ জুলাই থেকে ব্যবহার করা বাধ্যতামুলক হবে। এর মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে, কর ফাঁকি কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গভর্নর বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ, জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সতর্ক মুদ্রানীতি পরিচালনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেেক বাজেটে সহায়তা পাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
গভর্নর জানান, সরকার দ্বিপক্ষীয়ভাবে অধিক তেল রফতানিকারক দেশগুলো থেকে কমদামে জ্বালানি আমদানির সুবিধা নিশ্চিত করা কিংবা অনুদান হিসেবে জ্বালানী তেল পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বিভিন্ন দেশ সফরে যাচ্ছেন।
এছাড়া, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সাপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। জ্বালানী আমদানির বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সাপোর্ট নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বেশকিছু ঝূঁকি বা চাপ সৃষ্টিরও আশঙ্কা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকিংখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও এই রোডম্যাপের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ। গ্রাহকের অর্থ ফেরত, অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের তালিকা প্রকাশের দাবি জোরালো হচ্ছে, যা বাস্তবায়তি হলে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে।
ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম যখন ৬২-৬৫ ডলারে ছিল, তখন ফুয়েল আমদানিতে বছরে ব্যয় হতো ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এখন দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আমদানি ব্যয়ও সে তুলনায় বাড়বে। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা পেলে এই বাড়তি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। আমাদের রিজার্ভ ভালো আছে। কোনরকম ইন্টারভেনশন ছাড়াই এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, দীর্ঘমেয়াদি জিটুজি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যেসব ফুয়েল আমদানি করে, সেগুলো চুক্তিতে থাকা দামেই আমদানি হয়। সেগুলো যাতে আমদানি অব্যাহত থাকে, সেজন্য সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন জানান, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিপুল সংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে পারে। এতে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি এসব বেকার শ্রমিকদের অন্ন, বস্ত্র ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাপে পড়বে দেশ। আইএমএফ জ্বালানীতে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে সরকারকে শর্ত দিলে বাংলাদেশকে তা মানতে হবে। তখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। কঠিন শর্ত হলেও আইএমএফ এর ঋণ না নিলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি থেকে ঋণ পাওয়া যাবে না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা।
ডেপুটি গভর্নর জাকির হোসেন চৌধুরী বলেন, জ্বালানী তেলের আন্তর্জাতিক দর দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকলে সরকারের উপর বাড়তি ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হবে, যা বিদ্যমান রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
জ্বালানী তেলের প্রাইস এডজাস্টমেন্ট হলে মাল্টিলেয়ার এফেক্ট হবে এবং মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মুদ্রানীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা অস্ত্র ব্যবহার করে বর্ধিত মূল্যস্ফীতির খুব সামান্যই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ জানান, প্রতিবছর বর্ষাকালে আমদানির চাপ কম থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বিল্ড আপ করে। এ বছরও বর্ষাকালে আমদানির চাপ কম থাকবে, যা রিজার্ভ ও এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে। তবে ইম্পোরটেড ইনফ্লেশন এর একটা প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে, যা ফিসক্যাল রিস্ক তৈরি করবে। সেটা কিভাবে মিটিগেট করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তা করছে এবং ডেভেলপমেন্ট পার্টনার সঙ্গেও তা শেয়ার করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে গ্লোবাল প্লেয়াররাও সাফার করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিদিন আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন হয় ২৯০ মিলিয়ন ডলার।
সম্মিলিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা থেকে সরে আসার সুযোগ নেই জানিয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই কার্যক্রম আরও গতিশীল করা হবে। দ্রুতই এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগ পাবে এবং নতুন এই ব্যাংকে কোন রাজনৈতিক প্রভাব থাকুক, তা আমি চাই না।
ব্যাবসায়ীদের হিসাব ফ্রিজিং ও অন্যান্য বিষয়ে গত বুধবার দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপ ও পাশাপাশি ব্যবসায়ী ফোরামের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সভা করে তাদের সমস্যাগুলো জেনেছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, যেসব সমস্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলো সমাধান করা হবে।
সাংবাদিক ও র্অথনীতিবীদরা এ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানালেও কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ বৃদ্ধি, সুদের হার যৌক্তিক রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরবিশে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সতর্কতার কথাও তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ, এসএমই খাতের উন্নয়ন এবং বৈদেশিক ঝুঁকি মোকাবিলা-এই চারটি স্তরের ওপর দাড়িয়ে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এসব উদ্যোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। কারণ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথচলা।