Image description

হরমুজ প্রণালিতে টানটান উত্তেজনা এবং জাহাজ চলাচলে কার্যত স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক ইতোমধ্যে পাইপলাইনভিত্তিক সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিকল্প রুট দিয়ে তেল পরিবহন দ্রুত বাড়ছে। সৌদি আরব তাদের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সংযুক্ত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। চলতি মাসে এই পাইপলাইনে তেল পরিবহন দৈনিক প্রায় ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা শিগগিরই পূর্ণ সক্ষমতা ৭ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই পথে এগোচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। দেশটি হাবশান থেকে ফুজাইরাহ বন্দরে সংযুক্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি জোরদার করেছে। চলতি মাসের শুরুতে এই লাইনে দৈনিক গড় সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং বর্তমানে প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, ইরাকও বিকল্প রুট হিসেবে তুরস্ককে বেছে নিয়েছে। দেশটি তুরস্কের জেহান বন্দরের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলের কিরকুক অঞ্চল থেকে উৎপাদিত তেল কুর্দিস্তান হয়ে পাইপলাইনে এই বন্দরে পৌঁছানো হচ্ছে। যুদ্ধের আগে ইরাকের বড় অংশের তেল হরমুজ দিয়েই পরিবহন করা হতো।

তবে এই সংকটের মধ্যেও ইরান তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থামায়নি। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশটি এখনো প্রতিদিন ১ থেকে দেড় মিলিয়ন ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করছে।

এরই মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায়। ইরানের খার্গ দ্বীপে মার্কিন আঘাত দেশটির তেল অবকাঠামোর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দ্বীপ থেকেই ইরানের অধিকাংশ তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রিত হয়। মার্কিন পক্ষ দাবি করেছে, সেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও হামলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খার্গ দ্বীপের পাইপলাইন বা মজুত ব্যবস্থায় সামান্য ক্ষতিও বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যা ইতোমধ্যেই অস্থির বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।

এদিকে ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে নতুন শর্তের কথা বলছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপদ ব্যবহারের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করা উচিত, যা আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে সংঘাতের পর এই প্রণালির পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফিরে নাও যেতে পারে।

সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তৎপরতা বাড়ছে। লন্ডনে আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থার বৈঠকে আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি ‘নিরাপদ করিডোর’ তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

সংঘাত শুরুর পর মাত্র কয়েক সপ্তাহেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে গেছে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন সংখ্যাটি নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। ইতোমধ্যে একাধিক হামলা ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, নিখোঁজ ও আহতের ঘটনাও ঘটেছে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ সংকট শুধু আঞ্চলিক নয় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প পথ খোঁজার এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের জ্বালানি বাণিজ্যের ধরণই বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শীর্ষনিউজ