‘বাঁচাও বাঁচাও’, ‘বাবা-মা’—ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারদিক থেকে ভেসে আসছিল মানুষের আর্তনাদ। কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন, কেউ আবার বন্ধুদের খুঁজছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন একটি রাত পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। ছাদের ভারী ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে প্রাণ হারান ৪০ জন। আহত হন শতাধিক মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে বেঁচে ফেরা মানুষদের।
বলছিলামি, ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের টেলিভিশন কক্ষের ছাদ ধসে ঘটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে সেই ঘটনায় নিহত ছাত্র, কর্মচারী ও অতিথিদের।
দুর্ঘটনার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি মুছে যায়নি বিপুল কুমার সাহার মন থেকে। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় এসেছিলেন। দুর্ঘটনার ঠিক আগের দিন উঠেছিলেন জগন্নাথ হলে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বর্তমানে কর্মরত আছেন জগন্নাথ হলের প্রিন্সিপাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসেবে।
সেই রাতে জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’ দেখার জন্য টেলিভিশন কক্ষে বসেছিলেন বিপুল কুমার সাহা। নাটক দেখার একপর্যায়ে হঠাৎ ছাদ থেকে এক ফোঁটা পানি এসে পড়ে তার মাথায়। তিনি টিভি দেখা বন্ধ করে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ধসে পড়ে ছাদ।
দুর্ঘটনার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের স্মৃতি মুছে যায়নি বিপুল কুমার সাহার মন থেকে। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় এসেছিলেন। দুর্ঘটনার ঠিক আগের দিন উঠেছিলেন জগন্নাথ হলে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বর্তমানে কর্মরত আছেন জগন্নাথ হলের প্রিন্সিপাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসেবে।
বিপুল কুমার সাহার কাছে মনে হচ্ছিল, যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। পেছাতে গিয়ে তার পা আটকে যায়। ডান পায়ের হাঁটুর নিচে এসে পড়ে ভারী ধ্বংসস্তূপ। প্রথমে তার মনে হয়েছিল, পা বুঝি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পরে বুঝতে পারেন, পা অক্ষত থাকলেও তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন।
সেই রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ছাদ ধসের পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। চারদিকে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে চারদিক থেকে ভেসে আসছিল বাঁচার আকুতি আর স্বজনদের ডাক।
‘দুর্ঘটনার পর চারদিকের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে চারদিক থেকে ‘বাঁচাও বাঁচাও’, ‘বাবা-মা’ বলে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছিল। অন্ধকারের মাঝেই চিৎকার করতে করতে অনেকেই চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যান।’
৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও বিপুল কুমার সাহার স্মৃতিতে সেই রাতের আর্তনাদ যেন আজও জীবন্ত। যে ভবনটির ছাদ ধসে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ‘পরিষদ ভবন’ বা ‘অ্যাসেম্বলি হল’ নামে পরিচিত ছিল। একশ বছরেরও বেশি পুরোনো ভবনটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের পরিষদ ভবন বা সংসদ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে নতুন পরিষদ ভবন নির্মিত হলে পুরোনো ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুর্ঘটনার আগে এটি জগন্নাথ হলের টেলিভিশন কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ওই রাতে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও চারজন। সব মিলিয়ে প্রাণ হারান ৪০ জন। আহত হন শতাধিক মানুষ।
বিপুল কুমার সাহা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন হলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে তারা কাজ শুরু করেন। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
আহতদের অনেককে প্রথমে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়। যাদের মাথায় আঘাত ছিল, তাদের সেখানে রেখে অন্যদের পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ (সিএমএইচ) ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
জগন্নাথ হলের সেই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নয়, পুরো দেশকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। স্বজন হারানোর কান্না আর আহতদের বাঁচানোর আকুতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। তবে ভয়াবহ সেই পরিস্থিতিতেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল।
বিপুল কুমার সাহা জানান, আহতদের জীবন বাঁচাতে রিকশাচালক থেকে শুরু করে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়েছিলেন তারা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার লক্ষ্য ছিল একটাই—আহত মানুষগুলোকে বাঁচানো।
জগন্নাথ হলের এই ঘটনার ৪১ বছর পরও আবাসিক হলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বিপুল কুমার সাহা। তার মতে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সব আবাসিক হলেই ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নজরদারি ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানানোর পরই কেবল প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। বরং কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ভবনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থের সীমাবদ্ধতা থাকলে সরকারের বিশেষ অনুদান বা সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
বিপুল কুমার সাহার ভাষ্য, একজন শিক্ষার্থীর কাছে তার আবাসিক হল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করার কথা, থাকার কথা নিরাপদে। অথচ সেই হলেই পড়তে বসে মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
দিবসটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে প্রশাসন। এদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। শোক দিবস উপলক্ষে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান ভবন, সব হল ও হোস্টেলে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং কালো ব্যাজ ধারণ করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে শোক র্যালি, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও নীরবতা পালন, অক্টোবর স্মৃতি ভবনের টিভি কক্ষে আলোচনা সভা হবে। পাশাপাশি জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বাদ আছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিআ’সহ সব হল মসজিদে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হবে। হল প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিহতদের তৈলচিত্র ও তাদের বিষয়ে তথ্যসম্পর্কিত দ্রব্যাদি প্রদর্শন করার কর্মসূচি রয়েছে।