নরসিংদীর আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস এবারও এসএসসিতে শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের রেকর্ড গড়েছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে শিক্ষার্থীদের বাছাই করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা তলব করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এক শিক্ষার্থীর মা এনপিবি নিউজকে বলেন, তাঁর মেয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে ওই স্কুলে পড়াশোনা করেছে। ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল, খেলাধুলাতেও সক্রিয় ছিল। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, সে মূল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অভিভাবক বলেন, “ক্লাস ওয়ান থেকে মেয়েকে এই স্কুলে পড়িয়েছি। এসএসসি পরীক্ষার কয়েক দিন আগে বলা হলো, সে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এটা কেমন কথা? সবসময় ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল আমার মেয়ে।”
অভিযোগ রয়েছে, শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার ধারাবাহিক সুনাম ধরে রাখতে টেস্ট পরীক্ষাকে বাছাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মূল পরীক্ষার আগেই ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে নবম শ্রেণিতে মোট ৬০১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে ২১৯ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।
অন্যদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ১০১ জন অকৃতকার্য হওয়ায় ৩৮২ জনকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেস্ট পরীক্ষায় বাদ পড়া অনেক শিক্ষার্থী নরসিংদীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে শুধু সানবীম স্কুলেই ভর্তি হয়েছে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
এ ঘটনায় ব্যাখ্যা চেয়ে ১৬ আগস্ট নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তথ্য, নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং এসএসসির ফরম পূরণ করা শিক্ষার্থীদের তথ্যসহ সাত কর্মদিবসের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে স্কুলে গিয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এনপিবি নিউজকে বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফলের সাফল্য শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে অর্জিত হলে তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের পেছনে শিক্ষার্থীদের বাছাই বা ছাঁটাইয়ের কোনো সংস্কৃতি থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা প্রয়োজন।