Image description

ক্যাম্পাসে জমে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রচার। প্রায় ছয় বছর পর আরেকটি নির্বাচন দেখতে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষ। ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন। মঙ্গলবার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার অনুমতির পর ক্যাম্পাসে শুরু হয় নির্বাচনি উৎসব। প্রচারণার প্রথম দুই দিন প্রার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ফেস্টুন-ব্যানার লাগানো, ক্যাম্পাসে হেঁটে হেঁটে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট আহ্বান করেন। তবে বুধবার বিকালে প্রশাসনের নির্দেশে ক্যাম্পাস থেকে সব ব্যানার ফেস্টুন অপসারণ করা হলে ভাটা পড়ে নির্বাচনি প্রচারণায়।

নির্বাচনের আচরণবিধির ধারা-৭(ক) অনুযায়ী নির্বাচনি প্রচারণার জন্য কেবল সাদা-কালো পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ছাপানো ও বিলি করা যাবে। পিভিসি/কাপড় বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছাপানো বা লেখা ব্যানার/ফেস্টুন/বোর্ড টাঙানো যাবে না।

তবে নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম দুই দিন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, বাম জোটসহ বিভিন্ন দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজেদের ব্যানার-ফেস্টুন টাঙান টিএসসি ভবনের দেয়াল, কার্জন এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে। ফলে প্রচারের শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আসতে থাকে। নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিবেদন অনবরত আসতে থাকায় কড়াকড়িতে যায় নির্বাচন কমিশন। বুধবার বিকালের মধ্যে প্রশাসন সেগুলো সরিয়ে নেয়। এ কারণে প্রচারণার তৃতীয় ও চতুর্থ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারের আমেজেও কিছুটা ভাটা পড়ে।

ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্য প্যানেলের প্রার্থীদের শুরুর দুই দিনে ক্যাম্পাসে দলবল নিয়ে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেলেও গত দুই দিন ধরে সেটা তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে গতকাল প্রার্থীদের বিভিন্ন হলের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় ও লিফলেট হাতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে দেখা গেছে। প্রার্থীরা বিভিন্ন আবাসিক হলের রুমে গিয়েও প্রচারণা চালাচ্ছেন। অফলাইনের চেয়ে প্রচারণা বেশি দেখা যায় অনলাইনে। শিক্ষার্থীদের নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন ফটোকার্ড ও ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছেন প্রার্থীরা।

রাজনীতির ঊর্ধ্বে কল্যাণমুখী নেতৃত্ব : শিক্ষার্থীরা এমন প্রতিনিধি চান যে নিজের রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করবেন এবং দলীয় গোলামি না করে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবেন।

এ বিষয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমি এমন কাউকেই ভোট দেব যিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের লেজুড়বৃত্তি করবেন না, যিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয় বরং শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য কাজ করবেন।’

হলের সিট ও খাবারের মানোন্নয়ন : বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সিটসংকট ও নিম্নমানের খাবারের সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী সামিমারা আক্তার বলেন, ‘আমরা চাই ডাকসু নির্বাচনে যারা আগামী এক বছরের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন তারা যেন আবাসিক হলের সিটসংকট ও খাবারের মান নিয়ে কাজ করেন। তাদের কাছে দাবি থাকছে এ সমস্যাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকারের জন্য তারা কাজ করবেন। আমাদের যেন আর সিটের দাবিতে ভিসির বাসভবনের সামনে বসতে না হয়, নিম্নমানের খাবার খেয়ে অসুস্থ হতে না হয়।’

নিয়মিত ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন : ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে এএফ রহমান হলের শিক্ষার্থী সাদমান হোসেন বলেন, ‘ডাকসুতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে আমার প্রথম দাবি আরেকটি ডাকসু ও নিয়মিত ডাকসুর আয়োজন করা। প্রতি বছর একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ডাকসু আয়োজিত হবে, ফলে অপরাজনীতি চর্চা কমবে, ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীবান্ধব হবে, শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়মিত আদায়ের জন্য প্রশাসন চাপে থাকবে।’

শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ : শিক্ষার্থীরা মনে করেন, ডাকসুর প্রধান কাজ হওয়া উচিত পাঠদান ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা। ডাকসুর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা তাদের অন্যতম দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের শিক্ষার্থী মো. আরিয়ান বলেন, ‘আমরা চাই পড়াশোনার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, আর গবেষণার সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় দিনদিন একাডেমিক দিক থেকে সরে যাচ্ছে। কিউএস র‌্যাঙ্কিংয়েও অবনতি হচ্ছে। গবেষণা ও পড়াশোনার যথোপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করলে বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গতা পাবে।’

সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম : বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন বলেন, ‘শরীর চর্চার জন্য আমাদের সবাইকে সেন্ট্রাল জিমনেসিয়ামে যেতে হয়। সেখানে জিমের যথেষ্ট সরঞ্জাম নেই, অধিকাংশ সরঞ্জাম প্রায় অকেজো, পরিচ্ছন্নতারও অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া ও কয়েকটি হলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য উন্নতমানের জিমের ব্যবস্থা করা দরকার। এ ছাড়া প্রতিটি হলে ইনডোর-আউটডোর গেমস ও সাংস্কৃতিক চর্চার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত ও উন্নত করা দরকার।’

বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উন্মুক্ত হওয়ায় এখানে হরহামেশাই ভবঘুরে ও বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ থাকে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় নানা রকম বিড়ম্বনা ও নিরাপত্তাঝুঁকিতে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ক্যাম্পাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, কুয়েত মৈত্রী হল মূল ক্যাম্পাস থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে তাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ডাকসুর মাধ্যমে ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা চান শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেলকে আরও কার্যকর করে গড়ে তোলার দাবি তাদের।

যাতায়াতব্যবস্থার সংস্কার : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শহরের কেন্দ্রে হওয়ায় ক্যাম্পাসে ভারী যান চলাচল দেখা যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে রিকশা ভাড়া দিয়ে গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা। শিক্ষার্থীরা চান ক্যাম্পাসে বিশেষায়িত রিকশা ও পর্যাপ্ত শাটলের ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে গ্রিন ক্যাম্পাসের পরীক্ষামূলক শাটল সার্ভিস শিক্ষার্থীদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত পরিমাণে শাটল ও বিশেষায়িত যান ব্যবস্থার দাবি শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া বিভিন্ন রুটে ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানো এবং মানসম্পন্ন বাসের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।