Image description

খাবারে ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। নিয়মিত এ লবণযুক্ত খাবার খেলে হতে পারে প্রাণঘাতী ক্যানসার ও নানা ধরনের স্নায়ুরোগ। মানবদেহে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে এটির ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, খাবার মুখরোচক বা মজাদার করতে নামিদামি রেস্টুরেন্ট, হোটেল থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির খাবারেও ব্যবহার করা হচ্ছে টেস্টিং সল্ট। খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত এ লবণকে চাইনিজ সল্ট বা চাইনিজ লবণও বলা হয়ে থাকে। মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি) রাসায়নিক উপাদানে তৈরি এ লবণের কোনো পুষ্টিগুণ না থাকলেও খাবারের স্বাদ বাড়াতে স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পণ্যটির ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।

স্বাদ বাড়াতে হালিম, ঝালমুড়ি, চটপটি, ফুচকা, গ্রিল, পিজা, স্যান্ডউইচ, চানাচুর, ক্র্যাকার্স, ভেজিটেবল কারি, সয়া সস, কেচআপ, সাধারণ সস, বিস্কুট, নুডলস, চিপস ও স্যুপেও ব্যবহৃত হয় এ লবণ। টেস্টিং সল্ট দিয়ে রান্না করা খাবার সুস্বাদু হওয়ায় অনেকে কোনো বাছবিচার না করেই ব্যবহার করছেন। লবণটি পরিমাণে বেশি ও দীর্ঘদিন খেলে ডেকে আনে স্বাস্থ্যের জন্য মহাবিপদ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। টেস্টিং সল্ট খাওয়ার কারণে মাথাব্যথা, বুকজ্বালা, গ্যাস্ট্রিক, আলসার—এমনকি কোলন ও রেক্টাল ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। শিশু-কিশোররা নিয়মিত এমন খাবারে আসক্ত হলে ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি বলে জানান চিকিৎসকরা। স্নায়ুর বিভিন্ন জটিলতাসহ মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে এটির ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ তাদের। এ লবণ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হলেও রয়েছে সচেতনতার অভাব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সম্প্রতি ‘চাইনিজ রেস্টুরেন্ট সিনড্রোম’ নামে নতুন একটি অসুখের নামকরণ করেছেন। যার জন্য টেস্টিং সল্টকে দায়ী করছে সংস্থাটি।

দেশে চাইনিজ রেস্টুরেন্টের খাবারে টেস্টিং সল্টের প্রথম ব্যবহার শুরু হলেও এখন সাধারণ রেস্টুরেন্টে তো বটেই, এটা ছড়িয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানে, এমনকি ঘরের রান্না করা খাবারেও।

পুষ্টিবিদরা জানান, নীরব ঘাতক টেস্টিং সল্টের উপকারিতার চেয়ে অপকারিতাই বেশি। এ লবণ হাড় দুর্বল করে দিতে পারে, স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে খেলে টেস্টিং সল্ট নেই এমন অন্যান্য খাবারে অরুচি জন্মায়। ফলে না খেয়ে থাকার একটি প্রবণতাও তৈরি হয়। এসব খাবারের মধ্যে অধিকাংশই শিশু-কিশোরের কাছে লোভনীয়। ফলে এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শিশু-কিশোরদের ওপর। এটি বেশি পরিমাণে ব্যবহার হলে স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা একে স্নায়ুবিষ বলে থাকেন।

পু্ষ্টিবিদদের মতে, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট টমেটো ও পনিরে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। তাই খাবারে টেস্টিং সল্টের পরিবর্তে টমেটো ব্যবহার করলে পুষ্টিও পাওয়া যায়, খাবারের স্বাদও বাড়ে।

কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, সময়ের অভাবে অনেকেই ঘরে রান্না করা খাবার খেতে পারেন না। কর্মব্যস্ততায় প্রায়ই দুপুরের খাবার বাইরে খেতে হয়। বাইরের খাবার ঘরের রান্নার চেয়ে সুস্বাদু। বাইরে খেতে খেতে ঘরের খাবারে অরুচি এসেছে। টেস্টিং সল্ট দিয়ে তৈরি রেস্টুরেন্টের খাবার ক্ষতিকর জেনেও এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

রাজধানীর মনিপুরীপাড়া এলাকার মুদি দোকানি দিলু মিয়া জানান, তিনি প্রতিদিন ৫০-৬০ প্যাকেট টেস্টিং সল্ট বিক্রি করেন। ক্ষতিকর জেনেও বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ক্রেতার চাহিদার কারণেই পণ্যটি বিক্রি করছেন। ফার্মগেট এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সব দোকানিই টেস্টিং সল্ট বিক্রি করছেন। কারণ হিসেবে তারা ক্রেতাদের চাহিদার কথা উল্লেখ করেন।

লালমাটিয়ার ‘হোয়াইট হল’ রেস্টুরেন্টের কর্মচারী সালাউদ্দিন প্রশ্ন রেখে বলেন, টেস্টিং সল্ট ছাড়া ফাস্টফুড, চাইনিজ আইটেম টেস্ট হয় না কি? এ রেস্টুরেন্টের সেবাগ্রহীতা ঈশিকা, তামান্না ও নাবিল বলেন, জানি না খাবারের মধ্যে কী দেয়। তবে বাসার চেয়ে রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে ভালো লাগে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রোটিনজাতীয় খাবার থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ১৩ গ্রাম গ্লুটামেট খেতে পারে। কিন্তু রাসায়নিকভাবে তৈরি মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট খেতে পারে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৫ গ্রাম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এর চেয়ে অনেক বেশি মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট খেয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থাই, চাইনিজ ও ইন্ডিয়ান খাবারে টেস্টিং সল্ট বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। যারা চাইনিজ খাবার বেশি গ্রহণ করেন, তাদের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমানে ফাস্টফুডের দোকানগুলোতেও মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।

এদিকে ঘরোয়াভাবে তৈরি খাবারে নিয়মিত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারকে বিপজ্জনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো খাবারে ঝাঁঝালো নোনা স্বাদ পাওয়া গেলে বুঝতে হবে, তাতে টেস্টিং সল্ট আছে। বাজারে বিক্রি হওয়া পটেটো চিপসে মাত্রাতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয়।

টেস্টিং সল্টের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ ডা. এসকে রয় বলেন, দীর্ঘদিন টেস্টিং সল্ট খাওয়ায় অ্যাড্রেনাল গ্ল্যান্ডের অস্বাভাবিক গঠনে দেহে ইমিউন ডেফিশিয়েন্সি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেনক্রিয়াস (অগ্ন্যাশয়), লিভারের প্রদাহ, হরমোনাল ইমব্যালেন্স হতে পারে। সোডিয়াম গ্লুটামেট মস্তিষ্কের নিউরাল কোষকে উত্তেজিত করে থাকে। টেস্টিং সল্ট লিভারে চর্বি জমা করে রাখতে ভূমিকা রাখে, হাড় দুর্বল বা ক্ষয় করে থাকে। এটা খাবারে অরুচি জন্মায়, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃষ্টিশক্তি কমায়। এ লবণ বেশি খেলে মাথা ব্যথা বাড়ে, মাংসপেশিতে ব্যথা, হাত-পায়ে ঝিমঝিম বা অবশ লাগে, হার্টবিট দ্রুত হয়, মেধা বিকাশে বিঘ্ন ঘটতে পারে বা স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, টেস্টিং সল্টের কোনো পুষ্টিগুণ নেই। কিন্তু এ লবণ ভোক্তাদের মধ্যে মাদকের মতো আসক্তি তৈরি করে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, এতে পারকিনসন্স বা আলঝেইমারসের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। এককথায়, টেস্টিং সল্টকে স্নায়ুবিষ বলা যেতে পারে। টেস্টিং সল্টের ক্ষতিকর দিক প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন দেশে এটি বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির সমীক্ষায় বাজারে প্রচলিত আলুর চিপসের পাশাপাশি ৫৫টি নুডলস, পপকর্ন ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে অতিমাত্রায় টেস্টিং সল্ট পাওয়া গেছে।

দেশে টেস্টিং সল্ট নামের এ বিষ ক্রমাগত মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অন্যদিকে টেস্টিং সল্ট দেশে উৎপাদন ও বিপণন হয় বলে স্বীকার করেছে বিএসটিআই। তাদের বক্তব্য অনুসারে, বিএসটিআই ১৫৪টি পণ্যের দেখভাল করে থাকে। এর মধ্যে টেস্টিং সল্ট আইটেমটি নেই। আর মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য নয়। আইনগতভাবে এটি উৎপাদন ও বিপণন কাজে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার বিএসটিআইয়ের নেই। এটি আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনে বিএসটিআইয়ের কোনো অনুমোদন নিতে হয় না। ফলে বিএসটিআই এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অর্থাৎ বাংলাদেশে এ টেস্টিং সল্ট আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন করা হয় সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে, অর্থাৎ মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট নামে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা বলেন, টেস্টিং সল্টের বিষয়ে এখনো দেশে কোনো গবেষণা হয়নি। এটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই আইইডিসিআর টেস্টিং সল্ট ব্যবহার না করার জন্য জনসাধারণকে অনেক আগে থেকেই সচেতন করে আসছে। তবে এ সল্টের ব্যবহার বন্ধ করতে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো জোরালো কর্মসূচি না নেওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম আকতারুজ্জামান বলেন, নির্বিচারে প্রতিদিন টেস্টিং সল্ট খাওয়া ঠিক না। কেউ প্রতিদিন এ লবণ খেলে নানা রোগ হতে পারে। অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট মস্তিষ্কের গ্লুটামেট রিসেপ্টরকে খুব বেশি উত্তেজিত করে। এতে মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুবিক পদ্ধতির কাজে বিঘ্ন ঘটে। এতে মাথাব্যথা, মাংসপেশি ব্যথাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

পণ্যের গুণগত মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, টেস্টিং সল্ট আমদানির বিষয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। তবে জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর হলে সেটির ব্যবহার বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব।