রমজান শুরু হতেই দেশের সামর্থ্যবান মুসলিমরা জাকাত পরিশোধের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কিন্তু এ বছর হিসাব-নিকাশে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম গত রমজানের পর থেকে প্রতি ট্রয় আউন্স প্রায় ২,৯০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫,১০০ ডলারের বেশি পৌঁছেছে। এই উল্লম্ফন দেশের বাজারেও সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের এই মূল্যবৃদ্ধিই জাকাতের ‘নিসাব’— অর্থাৎ জাকাত ফরজ হওয়ার ন্যূনতম সম্পদের সীমা এবং জাকাতের পরিমাণে বড় প্রভাব ফেলেছে।
গত বছর যিনি ৭.৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের জন্য ২৮,১২৫ টাকা জাকাত প্রদান করেছিলেন, তার জন্য এবছর একই পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারের জন্য জাকাতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮,৯৩৮ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জাকাতদাতাকে প্রায় ২০,৮১৩ টাকা বেশি প্রদান করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে ভরির মূল্যের ঊর্ধ্বগতি মিলিতভাবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে কারও জাকাতযোগ্য সম্পদ যদি ২০ হাজার ডলার হয়, তবে তাকে ৫০০ ডলার জাকাত দিতে হবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে ওজন (গ্রাম বা ট্রয় আউন্স) ও বিশুদ্ধতা (ক্যারেট) জানা জরুরি। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। বাজারদর যদি প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ১০০ ডলার হয়, তবে প্রতি গ্রাম খাঁটি স্বর্ণের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬৪ ডলার। সে অনুযায়ী হিসাব করে জাকাত নির্ধারণ করতে হয়।
অবশ্য বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির নির্ধারিত দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম কিছুটা বেশি।
ইসলামে জাকাত হলো ফরজ ইবাদত, যার অর্থ ‘পবিত্রতা’ বা ‘বৃদ্ধি’। প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের সম্পদ ‘নিসাব’ অতিক্রম করে পূর্ণ একচন্দ্র বছর তার মালিকানায় থাকলে মোট সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ জাকাত দিতে হয়।
এক বছরে স্বর্ণে জাকাত বাড়লো ২০ হাজার ৮১৩ টাকা
দেশের স্বর্ণবাজারে অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের প্রভাবে জাকাতদাতাদের হিসাব-নিকাশে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম বাড়ার কারণে জাকাতের পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি (প্রায় ৮৫–৮৭.৪৮ গ্রাম) বা তার বেশি স্বর্ণ এক বছর ধরে থাকলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদে জাকাতের হার ধরা হয় ২.৫ শতাংশ।
গত বছর ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ঠিক একবছর পর, ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬১ হাজার টাকায়। অর্থাৎ একবছরে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে ১ লাখ ১১ হাজার টাকা, যা প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালে ৭.৫ ভরি স্বর্ণের মোট বাজারমূল্য ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, জাকাতের পরিমাণ দাঁড়াত ২৮ হাজার ১২৫ টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালে একই পরিমাণ স্বর্ণের বাজারমূল্য বেড়ে ১৯ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা, ফলে জাকাতের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকা। একবছরের ব্যবধানে দামের বৃদ্ধির কারণে জাকাত বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮১৩ টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২১-২২ ক্যারেটের গয়নায় সাধারণত ২৫-৩০ শতাংশ খাদ বা ভেজাল থাকতে পারে। তাই খাঁটি সোনার পরিমাণ নির্ধারণ করে বাজারমূল্য ধরে জাকাত হিসাব করা সুবিধাজনক। হানাফি ফিকহ অনুসারে, নিয়মিত ব্যবহৃত গয়নাও যদি নিসাব পরিমাণে পৌঁছায় এবং একবছর থাকে, তাও জাকাতের আওতায় আসে।
স্বর্ণের বাজারদর ওঠানামার কারণে জাকাতের অঙ্কও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্ধারিত বছরপূর্তির দিনে বর্তমান বাজারদর যাচাই করে সঠিক হিসাব করা জরুরি।
স্বর্ণের গহনার জাকাত কে দেবে?
ইসলামিক আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমদুল্লাহর মতে, স্ত্রীর স্বর্ণের মালিকানা স্বামীর নয়, স্ত্রীর নিজস্ব। তিনি উল্লেখ করেন, যদি স্বর্ণ বিয়ে বা উপহার হিসেবে স্ত্রীর কাছে আসে, তবে জাকাত দেওয়ার দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর। স্বামী চাইলে নিজের ইচ্ছায় স্ত্রীর জাকাত দিতে পারেন, তবে সেই ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে নিয়ত জানাতে হবে।
কত টাকা থাকলে জাকাত দিতে হয়?
সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, অথবা যদি কোনও ব্যক্তির কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকে, অর্থাৎ সাড়ে ৫২ ভরি রূপা বা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসার পণ্য বা অন্যান্য বিনিময়যোগ্য সম্পদ এবং সেটি তার কাছে একবছর থাকে, তবে সেই সম্পদের ওপর ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত ফরজ হয়।
জাকাত বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত আছে। প্রথম শর্ত হলো— নিসাব অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। নিসাব মানে হলো, স্বর্ণ বা রূপা বা তাদের সমপরিমাণ অর্থ। স্বর্ণের জন্য নিসাব ৮৫ গ্রাম, আর রূপার জন্য ৫৯৫ গ্রাম। অর্থাৎ, এ পরিমাণ সম্পদ যদি কারও কাছে থাকে, তবে তার ওপর জাকাত ফরজ।
দ্বিতীয় শর্ত হলো, নিসাবের সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্রবছর ধরে থাকা। তৃতীয় শর্ত হলো, সম্পদে পরিপূর্ণ মালিকানা (ওনারশিপ) থাকা। চতুর্থ শর্ত হলো, অতিরিক্ত সম্পদ থাকা, অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ থাকা। পঞ্চম শর্ত, ঋণগ্রস্ত না থাকা। যদি সম্পদের তুলনায় ঋণ বেশি থাকে, তবে জাকাত দেওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বর্ণ ও নগদ অর্থ একত্রিত করে জাকাত হিসাব করা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ, যদি কারও কাছে নগদ টাকা ও স্বর্ণ থাকে, তাদের বর্তমান মূল্য যোগ করে নিসাব পূর্ণ হলে যৌথভাবে জাকাত প্রদান করতে হবে।
সাড়ে তিন লাখ টাকা নগদ থাকলেই জাকাত দিতে হবে?
কারও কাছে যদি দৈনন্দিন খরচ বাদ দিয়ে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১২৫ টাকা এক বছর ধরে গচ্ছিত থাকে এবং তিনি যদি ঋণগ্রস্ত না হন, তাহলে তাকে এবার জাকাত দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী কারও কাছে যদি সাড়ে ৫২ তোলা বা ৫৯৫ গ্রাম রূপা এক বছরের জন্য থাকে, অথবা এই পরিমাণ রূপার মূল্যের নগদ অর্থ থাকে তাকে জাকাত দিতে হয়।
মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, “বর্তমান সমাজে স্বর্ণের মূল্য অনেক বেশি, আর রূপার মূল্য কম। তাই স্বর্ণের নিসাব ধরলে অনেকের জন্য জাকাত ফরজ হয় না। অপরদিকে, রূপার নিসাব ধরলে বেশি মানুষ উপকৃত হবে। তাই আমি রূপার নিসাব গ্রহণ করার পরামর্শ দিই।”
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি গ্রাম রূপার দাম এখন ৫৭৫ টাকা ছাড়িয়েছে। এর ফলে ৫৯৫ গ্রাম রূপার বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,৪২,১২৫ টাকা।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী, জাকাত ফরজ তখনই হয়, যখন সম্পদ নিসাব পরিমাণে এক বছর স্থিত থাকে এবং দৈনন্দিন খরচ বাদ দিয়ে তা জমা থাকে। অর্থাৎ, কারও কাছে যদি ৫৯৫ গ্রাম রূপা এক বছরের জন্য থাকে, অথবা সমমানের নগদ অর্থ (প্রায় ৩,৪২,১২৫ টাকা) দৈনন্দিন খরচ বাদে সঞ্চিত থাকে, তবে তাকে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক। হিসাব করলে, এই পরিমাণ রূপা বা নগদ অর্থের জাকাত দাঁড়ায় প্রায় ৮,৫৫৩ টাকা।
অবশ্য সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছর জাকাতের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্যে, যা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ১৫ হাজার ডলারের সমান। গত বছর এই সীমা ছিল প্রায় ৮ হাজার ডলার। অর্থাৎ, স্বর্ণের দাম বাড়ায় নিসাবের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে যাদের সম্পদ আগের বছর নিসাব অতিক্রম করেছিল, তাদের কেউ কেউ এখন সেই সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। ডলারের বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বছর কারও কাছে প্রায় ১৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকার বেশি নগদ অর্থ একবছর ধরে থাকলেই কেবল তার ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে। তবে দেশে স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় খানিকটা বেশি হওয়ায় স্থানীয় বাজারদর বিবেচনায় নিসাবের অঙ্ক আরও উঁচুতে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমানে দেশে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। সে হিসাবে সাড়ে ৭ ভরি (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ, কারও কাছে টানা একবছর এই পরিমাণ বা তার বেশি নগদ অর্থ থাকলে— তাকে সেই টাকার জাকাত দিতে হবে।
অপরদিকে, গত বছর একই হিসাবে নিসাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ফলে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একবছরে জাকাতের নিসাব কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে।
জাকাতের সামাজিক প্রভাব
স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন জাকাতের সামাজিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে। নিসাবের সীমা বেড়ে যাওয়ায় কিছু মানুষ জাকাতের আওতার বাইরে চলে যেতে পারেন, তবে যাদের হাতে উল্লেখযোগ্য স্বর্ণ বা উচ্চমূল্যের সম্পদ আছে, তাদের প্রদেয় জাকাতের অঙ্ক বেড়ে যাবে। এতে মোট জাকাত আদায়ও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দরিদ্রদের সহায়তার পাশাপাশি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দেশে বছরে প্রায় একলাখ কোটি টাকার জাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে আহরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “জাকাতের মূল দর্শন হলো— সম্পদের পুনর্বণ্টন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করা। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সহায়তা নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি মূল্য নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। ২০০০ সালে যেখানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় লাফ এসেছে ২০২৫ সালে— মাত্র একবছরে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি শুধু গয়নার বাজারের বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তারও প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ খোঁজে, স্বর্ণ তেমনই ‘নীরব আশ্রয়’ হিসেবে কাজ করছে।’’
জাকাত দেওয়ার সময়
শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন, ‘‘জাকাতের সময় নির্ধারিত হয় ব্যক্তির সম্পদের মালিকানা শুরু হওয়ার তারিখ অনুযায়ী। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ জিলহজ মাসে নিসাবের মালিক হন, পরবর্তী বছরের জিলহজে তার জাকাত দেওয়া ওয়াজিব হবে। তবে সুবিধার্থে আগেভাগে দেওয়াও বৈধ। রমজান মাসে দেওয়া বেশি সওয়াবের জন্য উৎসাহজনক হলেও, জাকাত দেওয়ার মাস নির্দিষ্ট নয়।’’
বাড়ি, ফ্ল্যাট বা যানবাহন
যদি কারও কাছে একটি বাড়ি বা তিনটি ফ্ল্যাট থাকে এবং এগুলো নিজস্ব বাসস্থানের জন্য বা ভাড়া দিয়ে সংসারের খরচ চলছে, এসব মূল সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নয়। তবে ভাড়া থেকে জমানো থাকা অর্থের ওপর জাকাত দেওয়ার দরকার হতে পারে।
ঋণ দেওয়া টাকার জাকাত
যদি কেউ কাউকে দীর্ঘকাল ধরে ঋণ (হাসানাহ বা সুদমুক্ত) দিয়ে থাকে এবং সে ফেরত দিতে পারছে না, তবে সেই টাকার জাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে টাকা পাওয়া গেলে, তখনই সেই টাকার ওপর জাকাত দেওয়া হবে।
যাচাই-বাছাই ছাড়া জাকাত নয়
জাকাত দেওয়ার আগে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কারও ব্যাংকে নিসাব পরিমাণ অর্থ (যা দিয়ে সাড়ে ৫২.৫ তোলা রূপা কেনা যায়) সঞ্চিত থাকলে সে নিজেই জাকাতদাতা—জাকাতগ্রহীতা নয়।
শায়খ আহমদুল্লাহর মতে, বাহ্যিকভাবে কাউকে দরিদ্র মনে হলেও বাস্তবে তার সম্পদ থাকতে পারে। আবার স্বল্প আয়ের অনেকে প্রকৃতপক্ষে বেশি অসচ্ছল। তাই আবেগ নয়, অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের ভিত্তিতে জাকাত বণ্টন করা উচিত। তার ভাষায়, “জাকাত একটি আমানত। প্রকৃত হকদারের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।”
জাকাত কাদেরকে দেওয়া যাবে
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হকদারের প্রথম দুটি শ্রেণী হলো— ফকির ও মিসকিন। ফকির বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার আয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে মৌলিক প্রয়োজন— খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা পূরণ হয় না। মাস শেষে তাকে ধার দেনা করতে হয় বা চরম টানাপোড়েনে চলতে হয়।
আর মিসকিন হলো সম্পূর্ণ নিঃস্ব ব্যক্তি, যার নিজের কোনও উপার্জন বা সম্পদ নেই। কারও মাসিক আয় এক লাখ টাকা হলেও যদি বিলাসী চাহিদা পূরণ না হয়, সেটি জাকাত পাওয়ার যোগ্যতা নয়। কিন্তু ঢাকায় ১৫-২০ হাজার টাকা আয়ে পরিবার নিয়ে কষ্টে চলা ব্যক্তি— যার মৌলিক প্রয়োজনই পূরণ হয় না, তিনি জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত হতে পারে বলে মনে করেন শায়খ আহমদুল্লাহ।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে। তবে শর্ত হলো, ঋণটি হতে হবে মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সৃষ্ট। চিকিৎসা বা জীবনধারণের প্রয়োজনে ঋণ হলে জাকাত দেওয়া যাবে। কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণ বা বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধে জাকাত দেওয়া বৈধ নয়। এর বাইরে দ্বীন প্রতিষ্ঠাসহ আরও কয়েকটি খাতে জাকাত দেওয়ার সুযোগ আছে।