জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও শিল্প খাতে। এরই মধ্যে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন দামে বাংলাদেশে কেরোসিনের দাম ভারতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একইভাবে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের দামও ভারতের তুলনায় বেশি।সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের তুলনায় প্রতিটি জ্বালানির দামই ২০ টাকা করে বেড়েছে।
সরকারের দেওয়া তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কলকাতায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা। নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা।
অর্থাৎ বাংলাদেশের নতুন ডিজেলের দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় কম হলেও ভারতের তুলনায় সামান্য বেশি।
কেরোসিনের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বেশি। ভারতে খোলাবাজারে বিভিন্ন অঞ্চলে কেরোসিনের দাম বাংলাদেশের নতুন দামের তুলনায় অনেক কম। কলকাতায় খোলাবাজারের দাম প্রায় ৯২ রুপি হলেও অঞ্চলভেদে দাম আরও কম।
ফলে বাংলাদেশে ১৫৫ টাকা লিটার কেরোসিনের দাম ভারতের অনেক বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
পেট্রোলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে দাম বেশি। বাংলাদেশে নতুন দাম ১৬০ টাকা, আর ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে টাকায় রূপান্তর করলে দাম প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। অকটেনেও দুই দেশের দামের পার্থক্য রয়েছে।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা হচ্ছিল বলেও জানিয়েছে সরকার।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, জাহাজ ভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে পাচার ঠেকাতেও দাম সমন্বয় প্রয়োজন ছিল বলে জানান তিনি। দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী।
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন ও ব্যবসায় পড়তে শুরু করেছে। ডিজেল পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বন্দরের লজিস্টিকস খাতেও বাড়তি ব্যয়ের চাপের কথা উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, কৃষি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের দাম পুনরায় সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। আপাতত আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য, বিপিসির লোকসান এবং পাচারের ঝুঁকি—এই তিনটি বিষয়কে দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
শীর্ষনিউজ